আগারগাঁওয়ে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন সচিবালয়, মন্ত্রিসভার অনুমোদন
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে স্থানান্তরিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সচিবালয়। রোববার সচিবালয়ে আয়োজিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে এই সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে বৈঠক শেষে জানানো হয়েছে।
বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি জানান, সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠের ৩১ একর জমির ওপর নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৯ সালের মধ্যেই সেখানে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের সমন্বিত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং কাজের গতি বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের সার্বিক ব্যয় কত হবে, সেই হিসাব-নিকাশ এখনো চলমান রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
নতুন সচিবালয় নির্মাণের মহাপরিকল্পনায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন অবকাঠামোর কথা রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় বেজমেন্টসহ মোট ৩ হাজার ৮০০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে, যা বর্তমান এলাকার পার্কিং চাপের তুলনায় বড় পরিসরের উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
পরিকল্পনায় রয়েছে ১৪টি ১২ তলাবিশিষ্ট প্রশাসনিক ভবন। এর পাশাপাশি দুটি মসজিদ, একটি মাল্টিপারপাস হল, ক্যাফেটেরিয়া এবং একটি আধুনিক ডাকঘরও নতুন কমপ্লেক্সের অংশ হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে।
আগারগাঁও এলাকার যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বেশ কিছু আন্ডারগ্রাউন্ড রাস্তা ও আন্ডারপাস নির্মাণের কথাও পরিকল্পনায় রয়েছে। নতুন কমপ্লেক্স চালু হলে এলাকায় যানবাহনের চাপ বাড়তে পারে—সেই বিবেচনা থেকেই এই ব্যবস্থাগুলো রাখা হয়েছে বলে ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান সচিবালয়ের জায়গাটির ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, পুরান ঢাকার বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তর বা আদালতের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে স্থানান্তরের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে, তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরে নির্ধারণ করা হবে।
একই বৈঠকে প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে ‘মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নাম পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তও মন্ত্রিসভার অনুমোদনের তালিকায় ছিল।
দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, লেজিসলেটিভ যাচাই শেষে সোমবারই অধ্যাদেশটি জারি হতে পারে।
নতুন এই আইনি কাঠামোয় বৈশ্বিক সংঘাতের বাস্তবতায় জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবনে ওপেক্স এবং ক্যাপেক্স—উভয় মডেলে দীর্ঘমেয়াদে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ‘রটারডাম কনভেনশন অন দ্য প্রায়র ইনফর্মড কনসেন্ট প্রসিডিউর ফর সার্টেন হ্যাজার্ডাস কেমিক্যালস অ্যান্ড পেস্টিসাইডস ইন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড’-এ বাংলাদেশের যোগদানের প্রস্তাবও অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।
এই কনভেনশনে যোগদানের ফলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ক্ষতিকর ও বিষাক্ত রাসায়নিক কিংবা কীটনাশকের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে আমদানির আগেই অবগত হওয়ার এবং ঝুঁকি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। আগে বাংলাদেশ এই কনভেনশনের বাইরে ছিল; এখন থেকে বিপজ্জনক রাসায়নিক আমদানিতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ কাঠামো কার্যকর হবে বলে ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে।
বৈঠকে জাতীয় সংসদ ভবনের মাস্টার প্ল্যানের মূল কনসেপ্টেরও আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের ঐতিহাসিক স্থাপত্যশৈলীর মূল ভাবাদর্শ বজায় রেখে এবং কানের ফর্মুলার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই আধুনিক কিছু প্রয়োজনীয় সংযোজন যুক্ত করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। মূল কনসেপ্ট অনুমোদনের পর এখন স্থাপত্য, প্রকৌশল কাঠামো, বিদ্যুৎ এবং প্লাম্বিংসহ বিস্তারিত কারিগরি নকশা ধাপে ধাপে সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে এক বৈঠকেই সচিবালয় স্থানান্তর, মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন, সৌরবিদ্যুৎ অধ্যাদেশ, রটারডাম কনভেনশনে যোগদান এবং সংসদ ভবনের মাস্টার প্ল্যান—একাধিক বড় সিদ্ধান্ত অনুমোদন পেয়েছে। এখন নজর থাকবে নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্সের ব্যয় নির্ধারণ, নকশা চূড়ান্ত করা এবং ২০২৯ সালের লক্ষ্য অনুযায়ী নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার দিকে।


