কৃষি, বাণিজ্য ও সংস্কারে বাংলাদেশকে প্রায় ৩৯০ কোটি টাকার নতুন অনুদান দিচ্ছে কানাডা
বাংলাদেশের কৃষি, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সংস্কার ও বেসরকারি খাতের উন্নয়নে চারটি নতুন উদ্যোগে ৪ কোটি ৫০ লাখ কানাডিয়ান ডলার অনুদান ঘোষণা করেছে কানাডা। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৩৯০ কোটি টাকা। রোববার ঢাকার কানাডীয় হাইকমিশন এ তথ্য জানিয়েছে।
হাইকমিশন জানায়, গত ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশ সফরকালে এই অনুদানের ঘোষণা দেন কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সারাই। তাঁর এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা এবং দুই দেশের জনগণের জন্য উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করা।
সফরকালে প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ, গবেষণা কার্যক্রম ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি পরিদর্শন করেন। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তা কার্যক্রম এবং বেসরকারি খাতের কর্মকাণ্ডও তিনি সরেজমিনে দেখেন। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
ঘোষিত অনুদানের সবচেয়ে বড় দুটি অংশ পাচ্ছে বায়োএন্টারপ্রাইজ কানাডা ও কোওয়াটার ইন্টারন্যাশনাল—প্রতিটি প্রতিষ্ঠান পাবে ১ কোটি ৮০ লাখ করে কানাডিয়ান ডলার। বায়োএন্টারপ্রাইজের উদ্যোগের লক্ষ্য কানাডার কৃষি খাতের উদ্ভাবকদের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য খাতের সংযোগ ঘটিয়ে খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করা।
কোওয়াটার ইন্টারন্যাশনালের অর্থ ব্যয় হবে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা সহজ করা, ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন এবং কানাডাসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগে। অর্থাৎ নিয়মকানুনের জটিলতা কমিয়ে বাংলাদেশি পণ্য ও সেবার জন্য বিদেশি বাজার খুলে দেওয়াই এই অংশের মূল লক্ষ্য।
এছাড়া অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সংস্কারে অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগ এগিয়ে নিতে বিশ্বব্যাংককে দেওয়া হবে ৫০ লাখ কানাডিয়ান ডলার। আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো ও বেসরকারি খাতের বিকাশে সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) পাবে ৪০ লাখ কানাডিয়ান ডলার।
হাইকমিশনের ভাষ্যে, এই চারটি উদ্যোগের মাধ্যমে কানাডা বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের পারস্পরিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
সফরকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিনের সঙ্গে বৈঠক করেন রণদীপ সারাই। বৈঠকগুলোতে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, জ্বালানি ও জলবায়ু অর্থায়নে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। রোহিঙ্গা সংকট ও এর টেকসই সমাধানে যৌথ প্রচেষ্টার গুরুত্ব নিয়েও মতবিনিময় হয়।
সফরের অংশ হিসেবে ঢাকার আশকোনায় ব্র্যাকের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণকেন্দ্র পরিদর্শন করেন প্রতিমন্ত্রী। সেখানে তিনি দেখেন, কানাডার সহায়তায় তরুণ-তরুণীরা, বিশেষ করে নারীরা, কীভাবে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছেন। কানাডা, ব্র্যাক ও অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তর একটি উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই কার্যক্রম চলছে, যাতে কানাডা ৪ কোটি ৪০ লাখ কানাডিয়ান ডলার সহায়তা দিয়েছে এবং যা গত পাঁচ বছর ধরে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
ঢাকায় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) হাসপাতাল পরিদর্শনকালে কানাডার সহায়তায় পরিচালিত গবেষণা কার্যক্রম সম্পর্কেও অবগত হন তিনি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কানাডা ১ কোটি ৫০ লাখ কানাডিয়ান ডলার অনুদান দিয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়া কানাডাই একমাত্র দেশ, যারা আইসিডিডিআর,বিকে এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিয়ে আসছে। এছাড়া যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণার জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে আরও ২ কোটি ৪০ লাখ কানাডিয়ান ডলার সহায়তা দিয়েছে কানাডা।
কক্সবাজারে গিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন কানাডার প্রতিমন্ত্রী। ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত রোহিঙ্গা সহায়তায় কানাডা ৬০ কোটি কানাডিয়ান ডলারেরও বেশি সহায়তা দিয়েছে, যা শিক্ষা, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও জীবিকার সুযোগ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে। সেখানে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সঙ্গেও তাঁর বৈঠক হয়।
কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্রের (সিমিট) একটি প্রদর্শনী কেন্দ্রও পরিদর্শন করেন রণদীপ সারাই। সব মিলিয়ে নতুন এই অনুদান প্যাকেজ কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা থেকে শুরু করে বাণিজ্য, সংস্কার ও বেসরকারি খাত—বাংলাদেশ-কানাডা সহযোগিতার প্রায় সব প্রধান ক্ষেত্রকেই একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।





