কাতারে গ্রেপ্তার বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান শেখ আব্দুল হান্নান, জানাল দুদক
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলার আসামি বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল শেখ আব্দুল হান্নানকে কাতারে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রোববার (১৮ অক্টোবর) দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তবে কখন, কীভাবে এবং কোন সংস্থা তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো জানাতে পারেনি দুদক। বিস্তারিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি জানিয়ে দুদক সচিব বলেছেন, এ বিষয়ে পরে সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হবে। ফলে গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া এবং তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা জানতে সংবাদ সম্মেলন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
শেখ আব্দুল হান্নান ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। তিনি ২০২১ সালের ১২ জুন বিমানবাহিনীর ১৬তম প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ২০২৪ সালের ১১ জুন অবসরে যান। বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে থাকা একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা এবং পরে বিদেশে গ্রেপ্তারের ঘটনা তাই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দুদক জানিয়েছে, হান্নানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগের বিষয়ে সংস্থাটি অনুসন্ধান করছিল। দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের মধ্যেই ২০২৫ সালের ৫ মে হান্নান, তাঁর স্ত্রী তাহমিদা বেগম ও ছেলে শেখ লাবিব হান্নানের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত।
এর পরদিন দুদকের আবেদনে হান্নানের জমি, বাড়ি ও তিনটি ফ্ল্যাট জব্দের আদেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁর ছয়টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেন আদালত। সম্পদ জব্দ ও হিসাব অবরুদ্ধের এই ধারাবাহিক আদেশ থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, অনুসন্ধানটি কেবল প্রাথমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না।
একই বছরের ২৪ মে হান্নান, তাঁর স্ত্রী ও ছেলের নামে থাকা মোট ৩৮টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেওয়া হয়। এরপর ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর হান্নানের সহযোগী সানজিদা আক্তারের নামে থাকা দুটি ফ্ল্যাট জব্দ এবং ১০টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেন আদালত।
দুদকের আবেদনে সে সময় অভিযোগ করা হয়, অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ গোপন করতেই সানজিদার নামে ফ্ল্যাট দুটি কেনা হয়েছিল। এই অভিযোগ মামলার পরিধি হান্নানের পরিবারের বাইরেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের দিকে ছড়িয়ে দেয়।
শেখ আব্দুল হান্নান ও তাঁর স্ত্রী তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দুটি মামলা করে দুদক। দুদকের উপপরিচালক মো. তানজির হাসিব সরকার বাদী হয়ে সংস্থাটির সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এ মামলা দুটি দায়ের করেন।
দুদকের অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে, হান্নান জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ৩ কোটি ২৮ লাখ ৫১ হাজার ৫০৬ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। পাশাপাশি তাঁর নামে থাকা ছয়টি ব্যাংক হিসাবে ২৭ কোটি ৬৩ লাখ ৬৬ হাজার ৭০০ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়।
তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করা হয়। অর্থাৎ অভিযোগ শুধু সম্পদ অর্জনেই সীমাবদ্ধ নয়, সেই অর্থের লেনদেন ও পাচারের দিকটিও মামলার অংশ।
অপর মামলায় হান্নানের স্ত্রী তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৯১ লাখ ৯০ হাজার ৩০৪ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। এছাড়া তাঁর নামে থাকা ৩২টি ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ১৮ লাখ ১৯ হাজার ৯২৩ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা জানায় দুদক।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, স্বামীর সহায়তায় তাহমিদা এসব সম্পদ অর্জন করেছেন। ওই মামলায় তাহমিদার পাশাপাশি শেখ আব্দুল হান্নানকেও আসামি করা হয়। ফলে দুটি মামলাতেই হান্নান আসামি হিসেবে রয়েছেন।
দুদকের অনুসন্ধানে কাতার, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে হান্নানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সম্পদের তথ্য পাওয়ার কথাও জানানো হয়েছিল। এছাড়া কানাডায় তাঁর সন্তানদের নামে বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়ার দাবি করে সংস্থাটি। এসব সম্পদের বিস্তারিত তথ্য মামলার তদন্তে যাচাই করা হবে বলে সে সময় জানানো হয়।
কাতারে গ্রেপ্তারের খবর আসায় এখন প্রশ্ন উঠেছে, তাঁকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় হাজির করা হবে কীভাবে এবং কবে। দুদক বলেছে, এ বিষয়ে পরে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে—সেদিকেই এখন সবার নজর।






