বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
সর্বশেষ হালনাগাদ:
প্রচ্ছদ › অর্থনীতি ও ব্যবসা › খবর
বিজ্ঞাপন
এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিনবড়লেখা টুডে — বড়লেখা-সিলেট ও প্রবাসের নিয়মিত পাঠকের কাছে আপনার ব্যবসাকে পৌঁছে দিনবিজ্ঞাপনের তথ্য →
অর্থনীতি ও ব্যবসা

ঋণ আর সঞ্চয় ভেঙে চলছে তিন কোটি মানুষের সংসার, তিন ফাঁদে অর্থনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক • • পড়ার সময়: ৮ মিনিট

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একসঙ্গে তিনটি গভীর কাঠামোগত সংকটে আটকে আছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। প্রথম সংকটটি ঘরে ঘরে — কাজ করেও বহু পরিবার প্রয়োজনীয় আয় করতে পারছে না, ফলে ঋণ করে কিংবা সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাতে হচ্ছে। দ্বিতীয় সংকট বিনিয়োগের স্থবিরতা, যার কারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়েছে। আর তৃতীয়টি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা। গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) বলছে, পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই তিন ফাঁদ দেশকে ‘উচ্চ দারিদ্র্য, নিম্ন বিনিয়োগ, নিম্ন প্রবৃদ্ধি’র চক্রে ফেলে দিয়েছে।

‘বাংলাদেশের প্রকৃত অর্থনীতির অবস্থা: দারিদ্র্যের পুনরাবির্ভাব ও টিকে থাকার সক্ষমতার গতিশীলতা’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস উপলক্ষে শনিবার ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে বই আকারে প্রকাশ করা হয়। গত বছরের মে মাসে দেশের আট বিভাগের গ্রাম ও শহর মিলিয়ে ৮ হাজার ৬৭টি পরিবারের ওপর চালানো জরিপের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি। মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে গবেষণার মূল দিকগুলো তুলে ধরেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান ও জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী নামিরা শামীম।

অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক, একশনএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির এবং বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেম। স্বাগত বক্তব্য দেন পিপিআরসির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সৈয়দ এম হাশেমী। আলোচনায় বারবার উঠে আসে একই কথা — সংকটের মূল কারণ অর্থের অভাব নয়, আস্থার অভাব।

হোসেন জিল্লুর রহমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিনিয়োগের স্থবিরতা আর সংস্কারহীন প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। তাঁর ভাষায়, একদিকে মানুষের ঋণের বোঝা বাড়ছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ হচ্ছে না — আর এর জন্য অর্থের সংকট নয়, আস্থার সংকটই প্রধানত দায়ী। অর্থের অপচয়ের দিকেও তিনি ইঙ্গিত করেন: গরিব দেশে ভবন তৈরি হচ্ছে কিন্তু ব্যবহার হচ্ছে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে কিন্তু পড়াশোনা হচ্ছে না, ফলে বাইরে থেকে লোক এনে কারখানা চালাতে হচ্ছে। তাঁর মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি গুণগত মানের শিক্ষায় জোর দেওয়া।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ‘ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত’ ধারণাটি। পিপিআরসির হিসাব অনুযায়ী, দেশের ১৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ পরিবার এখন এই শ্রেণিতে পড়ে — দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকলেও তাদের ব্যয় করার সক্ষমতা খুবই কম। সংখ্যার হিসাবে এই মানুষের পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, এসব পরিবারের অর্ধেকের বেশি ক্ষেত্রে ঋণের পরিমাণ সঞ্চয়ের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ সামান্য একটি ধাক্কা — অসুখ, চাকরি হারানো কিংবা দাম বৃদ্ধি — এলেই তারা সরাসরি দারিদ্র্যের দিকে নেমে যেতে পারেন।

দারিদ্র্যের সামগ্রিক চিত্রও পেছনের দিকে হাঁটছে। প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে দেশের ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ মানুষ উচ্চ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল, যেখানে ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে চরম দারিদ্র্য ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে পৌঁছেছে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে। দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য কমার যে ধারা ছিল, তা যে উল্টো দিকে ঘুরে গেছে, এই পরিসংখ্যান তা স্পষ্ট করে।

পরিবারের আয়-ব্যয়ের হিসাব আরও করুণ। জরিপ অনুযায়ী, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা, আর ব্যয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা — মাস শেষে হাতে থাকে মাত্র ৭০ টাকা। সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ পরিবারের গড় মাসিক আয় ৮ হাজার ৪৭৭ টাকা হলেও ব্যয় ১২ হাজার ২৯৪ টাকা; ঘাটতি মেটাতে তাদের ঋণ করা কিংবা সঞ্চয় ভাঙা ছাড়া উপায় থাকে না। সর্বনিম্ন আয়ের ৪০ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ১৫ হাজার টাকারও কম, আর তাদের আয়ের ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশই চলে যায় শুধু খাবারের পেছনে। ফলে শিক্ষা, যাতায়াত ও চিকিৎসার জন্য হাতে প্রায় কিছুই থাকে না। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৭ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, চিকিৎসা ব্যয়ই তাদের আর্থিক সংকটের অন্যতম বড় কারণ।

দ্বিতীয় ফাঁদটি বিনিয়োগ নিয়ে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাসের প্রসঙ্গ টেনে পিপিআরসি বলছে, গত অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি — দুই ধরনের বিনিয়োগই কমেছে। নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ১৫ শতাংশ, আর এর মধ্যে নতুন মূলধন বিনিয়োগ কমেছে সবচেয়ে বেশি, ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ। এই স্থবিরতা দীর্ঘ হলে নতুন শিল্প গড়ে ওঠা, উৎপাদন বাড়ানো ও মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ আরও সংকুচিত হবে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের প্রসঙ্গও এসেছে প্রতিবেদনে। দেশে ছোট উদ্যোগের সংখ্যা অনেক হলেও সেগুলোকে বড়, উৎপাদনশীল ও টেকসই প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার সুযোগ সীমিত। নতুন ব্যবসা চালু হলেও তা পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান কিংবা আয় তৈরি করতে পারছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতার সঙ্গে চাকরির চাহিদার অমিল। ফলে মানুষ কাজে যুক্ত থাকলেও উন্নত জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় আয় ও নিরাপত্তা পাচ্ছেন না — এটাই এই ফাঁদের মূল চরিত্র।

তৃতীয় ফাঁদ হিসেবে পিপিআরসি চিহ্নিত করেছে রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা, ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধি, রাজনৈতিক প্রভাবাধীন অর্থায়ন ও সরকারি ব্যয়ে অদক্ষতার একটি ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল, গণ-অভ্যুত্থানের পরও যার বড় অংশ টিকে আছে। কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে আসায় উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় সরকারের ব্যয় করার সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। ঋণনির্ভর উন্নয়ন কৌশল আবার ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়িয়ে বাজেটের ওপর বাড়তি বোঝা তৈরি করছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, খামখেয়ালি ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা রাজস্ব ফাঁকি, ব্যবসায়িক হয়রানি ও অন্যায্য সুবিধা আদায়ের সুযোগ বাড়াচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ দেওয়া ও নিয়ম প্রয়োগের দুর্বলতায় বেড়েছে খেলাপি ঋণও — ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে। সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সবাই একমত হলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে উদ্যোগের আগ্রহ কম বলেই পর্যবেক্ষণ সংস্থাটির।

এই ফাঁদগুলো ভাঙতে পাঁচটি অগ্রাধিকারের কথা বলেছে পিপিআরসি। প্রথমত, অর্থনৈতিক গণতন্ত্র ও সবার জন্য ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, যাতে ব্যবসা, ঋণ, লাইসেন্স, জমি কিংবা সরকারি চুক্তির জন্য বিশেষ সুবিধার ওপর নির্ভর করতে না হয়। দ্বিতীয়ত, প্রবৃদ্ধির নতুন চালক তৈরি — কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধশিল্প, হালকা প্রকৌশল, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরবরাহব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবহন-সরবরাহসেবা ও পরিচর্যাসেবাকে এ তালিকায় রাখা হয়েছে। তৃতীয়ত, মানসম্মত শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া — শুধু ভর্তি নয়, মৌলিক শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা, ডিজিটাল জ্ঞান ও নিয়োগদাতাদের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ বাড়ানো। চতুর্থত, ক্ষুদ্র উদ্যোগকে বড় ও রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার পথ করে দেওয়া। আর পঞ্চমত, দ্রুত ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা — স্বচ্ছ, সময়সীমাবদ্ধ ও ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত সরকারি সেবা।

আলোচকদের বক্তব্যেও উঠে আসে একই উদ্বেগ। সিপিডির মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশে আয়বৈষম্য দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে এবং প্রবৃদ্ধি আগের মতো মানুষকে দ্রুত দারিদ্র্যমুক্ত করতে পারছে না; নানা হয়রানির কারণে অনেক রপ্তানিকারক রপ্তানি করাই ছেড়ে দেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, যে বৈষম্য দূর করার জন্য জুলাইয়ে আন্দোলন হয়েছিল, নীতিনির্ধারকদের কাছে তা অর্থবহ হচ্ছে না। এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, ২০ বছর ধরে পোশাক খাত ছাড়া অন্য কোনো খাত দাঁড়াতে পারেনি, আর ডিগ্রি এখন আর চাকরির নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের জ্যঁ পেম বাণিজ্য, সরকারি অর্থায়ন ও জ্বালানি-দক্ষতা বাড়াতে কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা বলেন, আর একশনএইডের ফারাহ কবির প্রশ্ন তোলেন — দুর্নীতি ও হয়রানির স্বাভাবিকীকরণ বহাল রেখে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে কি না। সব মিলিয়ে প্রতিবেদনটির বার্তা পরিষ্কার: ফাঁদগুলো না ভাঙলে সংখ্যায় প্রবৃদ্ধি এলেও সাধারণ মানুষের জীবনে তার ছোঁয়া লাগবে না।

বিজ্ঞাপন
এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিনবড়লেখা টুডে — বড়লেখা-সিলেট ও প্রবাসের নিয়মিত পাঠকের কাছে আপনার ব্যবসাকে পৌঁছে দিনবিজ্ঞাপনের তথ্য →

অর্থনীতি ও ব্যবসা বিভাগের আরও খবর

অর্থনীতি ও ব্যবসা • ৪ মিনিটে পড়ুন

উচ্চ রক্তচাপ এখন দেশের শীর্ষ রোগ, নিয়ন্ত্রণে টেকসই অর্থায়নের দাবি কর্মশালায়

বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বাজেটের বরাদ্দ বাড়ানো এবং ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য ও গণমাধ্য…

অর্থনীতি ও ব্যবসা • ১ মিনিটে পড়ুন

শেয়ারহোল্ডারদের ৫৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেবে রেনাটা

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি রেনাটার পরিচালনা পর্ষদ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৫৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।…

অর্থনীতি ও ব্যবসা • ৪ মিনিটে পড়ুন

ভোগের প্রকাশক কন্ডে নাস্টের ব্রিটেনে লাভ কমল তিনভাগের একভাগের বেশি, বিক্রির সম্ভাবনা নাকচ মালিকপক্ষের

বিলাসবহুল পত্রিকার সাম্রাজ্য কন্ডে নাস্টের যুক্তরাজ্য শাখার লাভ গত বছর তিনভাগের একভাগের বেশি কমে গেছে। ভোগ থেকে জিকিউ পর্যন্ত পত্রিকার মালিক ধনকুবের প…

অর্থনীতি ও ব্যবসা • ৩ মিনিটে পড়ুন

সওজের চার শতাধিক স্থাপনার ছাদে বসবে সৌর প্যানেল, উৎপাদন হবে ৫,১৪৪ কিলোওয়াট

সারা দেশে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) চার শতাধিক স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তরের ভবনের ছাদ ও অব্যবহৃত খালি জ…