দুই সপ্তাহের মধ্যে টিকা দিতে হবে ছয় মাস থেকে নয় বছরের বাদ পড়া শিশুদের: হাম ঠেকাতে বিশেষজ্ঞদের জরুরি সুপারিশ
হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় টিকা না পাওয়া ছয় মাস থেকে নয় বছর বয়সী শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়ার সুপারিশ করেছে যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল। সংক্রমণ ও টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা বেশি—এমন জেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে বলেছে দলটি, আর এই কার্যক্রম দুই সপ্তাহের মধ্যে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল আটটা থেকে রোববার সকাল আটটা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে; এ সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ১ হাজার ৩১৯ জন।
গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ২ লাখ ৩৬ হাজার ৩৬৬ জন রোগী হাসপাতালে এসেছে। এ সময়ে হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত হামে ১ হাজার ১৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ বছর মার্চে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
সরকার ধারণা করেছিল টিকার মাধ্যমে তারা প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। ৫ এপ্রিল শুরু হওয়া হাম-রুবেলা টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন শেষ হয় ২০ মে। এরপর নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি ক্যাম্পেইনে বাদ পড়া শিশুদেরও টিকা দেওয়া অব্যাহত রেখেছে স্বাস্থ্য বিভাগ; কিন্তু হাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এ পরিস্থিতিতে যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দলের সুপারিশ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগ নজরদারি পর্যালোচনার অংশ হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত ৭০ সদস্যের যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল এসব সুপারিশ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক মঞ্চের প্রতিনিধি এবং দেশি জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত এই দলের মূল্যায়ন গত বুধবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক কর্মশালায় উপস্থাপন করা হয়।
কেন এই বিস্ফোরণ? দলটি বলেছে, টিকাদানের ব্যর্থতার কারণেই বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাবের বিস্ফোরণ ঘটেছে। ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিপুলসংখ্যক শিশুর টিকা থেকে বাদ পড়া, ২০২৫ সালে হাম-রুবেলার টিকার মজুত ফুরিয়ে যাওয়া এবং দুই বছরের বেশি বয়সী শিশুদের নিয়মিত টিকা থেকে বাদ দেওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া দেশের জনঘনত্ব ও প্রাদুর্ভাবে অপর্যাপ্ত সাড়াও প্রাদুর্ভাবকে এই পর্যায়ে এনেছে বলে দলটি মনে করে।
সুপারিশের তালিকায় আরও রয়েছে—বাদ পড়া শিশু ও সংক্রমণ বেশি থাকা জেলাগুলোতে এখনই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দিতে হবে। নজরদারি ও রোগী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও জরুরি কিছু কাজ এখনই করার কথা বলেছে দলটি। ছয় মাস থেকে নয় বছর বয়সী টিকা না পাওয়া শিশুদের বাছাই করে টিকা দেওয়া এবং সংক্রমণ বেশি ও টিকা না পাওয়া শিশু বেশি—এমন জেলা বাছাই করে টিকা দেওয়া, এই দুটি কাজই দুই সপ্তাহের মধ্যে করতে হবে।
স্বাস্থ্যকর্মীদের টিকা দেওয়ারও সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের দুটি সুপারিশ আছে—হামের প্রাদুর্ভাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত ছয় মাস বয়সে হাম-রুবেলার টিকা দিতে হবে, আর ছয় মাসের কাছাকাছি বয়সী শিশুকে টিকা দেওয়ার পাশাপাশি পৃথক করে রাখতে হবে।
নজরদারির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখার কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। সন্দেহভাজন সব রোগীর (যাদের জ্বর ও র্যাশ আছে) নাম, ঠিকানা, বয়স, লিঙ্গসহ সাধারণ তথ্য ঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে। প্রতিটি হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে এবং হালনাগাদ রোগী ব্যবস্থাপনা নির্দেশনা হাসপাতালে রাখতে হবে। নতুন রোগীর ওপর সক্রিয় নজরদারি এবং জ্বর ও র্যাশ থাকা রোগীর ক্ষেত্রে জাতীয় নির্দেশনা অনুসরণ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশে রয়েছে টিকাদানের স্থানীয় পরিকল্পনা হালনাগাদ করা, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ীভাবে বাদ পড়া শিশুদের কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। যোগ্য সব শিশুকে ঠিক সময়ে নিয়মিত টিকা দিতে হবে; নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে শিশুদের সর্বোচ্চ বয়স দুই বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করতে বলা হয়েছে। বিদ্যালয়ে ভর্তির সময় শিশুদের টিকাদানের কার্ড যাচাই-বাছাই করার সুপারিশও রয়েছে, যাতে বাদ পড়া শিশুদের টিকা নিশ্চিত করা যায়।
পরবর্তী হাম-রুবেলার জাতীয় ক্যাম্পেইনের জন্য সময়মতো পরিকল্পনা করার কথাও বলেছে দলটি। সম্ভবত সেই ক্যাম্পেইন হবে ২০২৯ বা ২০৩০ সালে। এ ছাড়া টিকার কার্যকারিতার ওপর প্রভাব ফেলে এমন প্রাতিষ্ঠানিক ও মাঠপর্যায়ের ত্রুটিগুলো খতিয়ে দেখতে গবেষণা এবং নয় মাসের কম বয়সী শিশুদের তথ্য পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, ‘যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দলের সুপারিশ প্রায় সবগুলোই গুরুত্বপূর্ণ। আমরাও শিশুদের টিকাদানের বয়স বাড়ানোর কথা বলে আসছি। তবে হাম মোকাবিলায় কমিউনিটির সম্পৃক্ততার কথা সুপারিশে নেই; মনে হয় কিছুটা গুরুত্ব কম পেয়েছে।’ তার মতে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সহায়তা না দিলে, ওষুধের সহায়তা না দিলে তারা হাসপাতালে আসবে কেন—আর তারা চিকিৎসা না নিলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
এখন দেখার বিষয়, দুই সপ্তাহের এই সময়সীমা মেনে সরকার কত দ্রুত বাদ পড়া শিশুদের বাছাই করে অগ্রাধিকার জেলাগুলোতে টিকাদান শুরু করতে পারে। প্রাদুর্ভাব যত দীর্ঘ হচ্ছে, হাসপাতালে রোগীর চাপ ও মৃত্যুর সংখ্যা ততই বাড়ছে—বিশেষজ্ঞদের এই সুপারিশ বাস্তবায়নের গতিই ঠিক করে দেবে হাম কবে নিয়ন্ত্রণে আসবে।




