আইন লঙ্ঘন করে কলেজের পুকুর ভরাট: সিটি করপোরেশনের বাধায় থামল অধ্যক্ষের কাজ, নোটিশ দিচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর
জলাধার সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন করে সরকারি বরিশাল কলেজের একটি পুকুর ভরাটের অভিযোগ উঠেছে খোদ কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। পুকুরটি ভরাট করে সেখানে ছাত্রাবাস নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. মহিউদ্দিন। শনিবার রাতের আঁধারে বালু ফেলে পুকুরের একাংশ ভরাট করার পর রোববার দুপুরে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা। পরিবেশ অধিদপ্তরও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ভরাটের সত্যতা পেয়েছে এবং কলেজ কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরকারি বরিশাল কলেজের এই পুকুরের আয়তন একসময় ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ। রোববার সরেজমিনে দেখা গেছে, পুকুরটির দক্ষিণ পাশে বেশ কিছু জায়গা আগেই ভরাট করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে ট্রাকভরে বালু এনে পুকুরটিতে ফেলা হচ্ছিল। রাতের মধ্যে পুকুরের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ বালু দিয়ে ভরে ফেলা হয়। অভিযোগের তদন্তে আসা কর্মকর্তারা জানান, কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই এই ভরাট কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম টিপুর সহায়তায় শনিবার হঠাৎ পুকুরটি ভরাট করতে শুরু করে কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আশপাশের বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়রাও এই পুকুর ব্যবহার করে আসছিলেন। হঠাৎ করে রাতের আঁধারে বালু ফেলে জলাশয়টি ভরাট করা পুরো এলাকায় উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের কাছে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম টিপু। তিনি দাবি করেন, 'এটা একটা ডোবা। সেখানে অশ্বিনী কুমার দত্তের নামে ছাত্রাবাস করব আমরা। কলেজ কর্তৃপক্ষ সেখানে বালু ফেলছে।' তাঁর দাবি, 'এটা সিটি করপোরেশনের জায়গা নয়, কলেজের জায়গা। অথচ শনিবার রাতে প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন পুলিশ পাঠিয়ে বালু ফেলা বন্ধ করে দিয়েছেন।' সিটি করপোরেশন কীভাবে কলেজের কাজ বন্ধ করে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়ক লিংকন বায়েন অবশ্য কলেজ কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্য মানতে নারাজ। তিনি জানান, বরিশাল কলেজের পুকুরটি কলেজের বাউন্ডারির বাইরে অবস্থিত। এটি ভরাটের জন্য বহু আগে থেকেই চেষ্টা চলছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ নিয়ে আন্দোলনও করেছেন পরিবেশবাদীরা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বরিশাল কলেজের পুকুরটি বহু স্মৃতিবিজড়িত এবং এই পুকুর স্থানীয়দের পানির অভাব মেটাত। 'এখন সরকারি লোকজনই পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে পুকুরটি ভরাট করছে; যা পরিবেশ আইনের চরম লঙ্ঘন,' বলেন তিনি।
খবর পেয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের একটি দল রোববার দুপুরে ঘটনাস্থলে যায়। সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ শাখার প্রধান মো. লকিতুল্লাহ শিকদার জানান, 'প্রশাসকের নির্দেশ পেয়ে আমরা রোববার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলে তাঁকে মাটি ভরাট বন্ধ রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা জানিয়েছি। অধ্যক্ষ বলেছেন, তিনি কাজ বন্ধ রাখবেন। অন্যথায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।'
পুকুরটি কেন ভরাট করা যাবে না, সে প্রসঙ্গে কর্মকর্তারা বলছেন, এটি একটি জলাশয়। প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী মহানগরীর মধ্যে কোনো পুকুর ভরাট দণ্ডনীয় অপরাধ, এর শ্রেণি পরিবর্তনও নিষিদ্ধ। এই আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। কর্মকর্তাদের মন্তব্য, অধ্যক্ষ নিজে সরকারের কর্মকর্তা হয়ে এভাবে আইন ভেঙে বালু ফেলে পুকুর ভরাট করতে পারেন না।
জানতে চাইলে সরকারি বরিশাল কলেজের অধ্যক্ষ ড. মহিউদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, কলেজের গঠিত তিন সদস্যের একটি কমিটি ভরাট কাজের দায়িত্বে ছিল। ছাত্রদলের টিপু স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ায় সব সময় সেখানে থাকেন বলেও জানান তিনি। তবে তিনি কেন অনুমতি ছাড়াই জলাশয় ভরাটের মতো কাজে নামলেন, সে বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি অধ্যক্ষ।
এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের বরিশাল জেলা সহকারী পরিচালক কাজী সাইফুদ্দিন জানান, তিনি খবর পেয়ে রোববার সকালে লোক পাঠিয়েছেন। তাঁরা পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে পুকুর ভরাটের সত্যতা পেয়েছেন। কলেজ কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। নোটিশে পরিবেশ আইনের কোন কোন ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে, তা উল্লেখ করা হবে বলে জানান তিনি।
এ ধরনের জলাশয় ভরাটের ঘটনা বরিশালে নতুন নয়। শহরের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে একের পর এক পুকুর ও জলাশয় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে বরিশালের পানির ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে। শহরের নিম্নভূমি ও পুকুরগুলোই প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম, সেগুলো হারিয়ে গেলে বিপর্যয় অনিবার্য।
পরিবেশ আইনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা গেলে এ ধরনের অনিয়ম ঠেকানো সম্ভব। আইনে বলা আছে, সিটি করপোরেশন এলাকায় কোনো পুকুর, জলাশয়, নদী বা খাল ভরাট করা যাবে না। এমনকি এর শ্রেণি পরিবর্তনও নিষেধ। তবু বাস্তবতায় প্রভাবশালীদের হাতে আইন অকার্যকর হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। বরিশালের এই ঘটনা সেই পুরনো অভিযোগকেই আবার সামনে নিয়ে এল।
এখন সবার চোখ পরিবেশ অধিদপ্তরের নোটিশ ও সিটি করপোরেশনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। নোটিশের জবাব কী আসে, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা হয় কি না, কিংবা ভরাট করা অংশ পুনরুদ্ধার করে পুকুরটি আবার খনন করা হয় কি না—সেসব প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় বরিশালবাসী। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, জলাশয়টি যেন আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয় এবং ভবিষ্যতে কেউ যেন এভাবে আইন লঙ্ঘন করতে না পারে, তার দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।



