আজ কবি ফররুখ আহমদের ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকী
আজ মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদের ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৪ সালের এই দিনে রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেনে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
ফররুখ আহমদ আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি। বিংশ শতাব্দীতে ইসলামি ভাবধারার বাহক হলেও তাঁর কবিতার প্রকরণকৌশল ও শব্দচয়ন ছিল অনন্য বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল, এবং আধুনিকতার নানা নন্দন তাঁর কবিতায় ছড়িয়ে ছিল।
সমালোচকদের মতে, রোমান্টিকতা থেকে আধুনিকতায় উত্তরণের ধারাবাহিকতায় ফররুখ আহমদের সৃষ্টিশীলতা ছিল মৌলিক। তাঁর কবিতায় বাংলার অধঃপতিত মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণের অনুপ্রেরণা প্রকাশ পেয়েছে।
ফররুখ ছিলেন স্বাধীনচেতা, আত্মমর্যাদাবান ও অতি উঁচু মাপের আধুনিক কবি। পশ্চিমা আধুনিক কবিদের রচনার আঙ্গিক ও বিশুদ্ধতা তাঁর কবিতায় দৃশ্যমান ছিল, আর তিনি ছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধের গণআন্দোলনসহ সব স্তরে তিনি ছিলেন সোচ্চার। কবির কলম অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিল, এবং জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তিনি মানবতা ও সাম্যের জয়গান গেয়েছেন।
কবি ফররুখ আহমদ ১৯১৮ সালের ১০ জুন মাগুরার মাঝআইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ হাতেম আলী এবং মাতা বেগম রওশন আখতার।
তিনি ১৯৩৭ সালে খুলনা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৩৯ সালে কলকাতার রিপন কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। পরে স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শন ও ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হলেও পরীক্ষা না দিয়েই তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।
১৯৪৫ সালে মাসিক ‘মোহাম্মাদী’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও স্থায়ীভাবে তিনি চাকরি করতেন ঢাকা বেতারে। ১৯৪২ সালের নভেম্বরে খালাতো বোন সৈয়দা তৈয়বা খাতুন লিলিকে বিয়ে করেন কবি।
সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করলেও ফররুখ আহমদের প্রধান পরিচিতি ছিল কবি হিসেবেই। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘সাত সাগরের মাঝি’ (১৯৪৪), ‘সিরাজাম মুনিরা’ (১৯৫২), ‘নৌফেল ও হাতেম’ (১৯৬১) এবং ‘হাতেমতায়ী’ (১৯৬৬)।
শিশুতোষ রচনাতেও তিনি রেখে গেছেন স্বাক্ষর। ‘পাখির বাসা’ (১৯৬৫), ‘হরফের ছড়া’ (১৯৭০) ও ‘ছড়ার আসর’ (১৯৭০) তাঁর শিশুতোষ রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬০), প্রেসিডেন্ট পুরস্কার প্রাইড অব পারফরম্যান্স (১৯৬১), আদমজী পুরস্কার (১৯৬৬) এবং ইউনেসকো পুরস্কার (১৯৬৬)।
মৃত্যুর পরও তাঁর প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান অব্যাহত ছিল — তিনি মরণোত্তর একুশে পদক (১৯৭৭) এবং স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৮০) লাভ করেন।
মৃত্যুর ৫২ বছর পর আজকের এই দিনে কবির জীবন ও কবিতা আবার স্মরণের কেন্দ্রে এসেছে — সেই কবিতা, যেখানে পুনর্জাগরণের ডাকের পাশাপাশি সমান জোরে উচ্চারিত হয়েছে মানবতা ও সাম্যের কথা।




