পিস্তলকাণ্ডে মন্ত্রিত্ব হারালেন ইশরাক, জনপ্রতিনিধিদের অস্ত্র প্রদর্শন নিয়ে ফের প্রশ্ন
মাদকবিরোধী অভিযানে প্রকাশ্যে পিস্তল হাতে অংশ নেওয়ার ঘটনায় সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিত্বই হারালেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনপ্রতিনিধিদের অস্ত্র প্রদর্শন নিয়ে পুরোনো প্রশ্নটিকে আবার সামনে এনেছে — জনগণের প্রতিনিধি হওয়া আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হওয়া এক কথা নয়।
গত ১৭ অক্টোবর রাজধানীর গেন্ডারিয়ার দয়াগঞ্জ রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে ইশরাকের অংশ নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, এক হাতে হ্যান্ডমাইকের মাউথপিস, অন্য হাতে পিস্তল নিয়ে কয়েকজনকে ধাওয়া করছেন তিনি। তার মুখে দাঁড়ানোর নির্দেশ, হাতে আগ্নেয়াস্ত্র।
ইশরাকের নিজের ব্যাখ্যা ছিল ভিন্ন। তার দাবি, মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় আত্মরক্ষার জন্য সতর্কতার সঙ্গে অস্ত্র প্রদর্শন করেছেন তিনি।
কিন্তু আত্মরক্ষার যুক্তি আর প্রকাশ্যে অস্ত্র তাক করার আইনি গ্রহণযোগ্যতা এক বিষয় নয়। ঢাকা মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে। আর পিস্তলকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিত্ব হারাতে হলো ইশরাক হোসেনকে।
ইশরাকের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একেবারে নতুন নয়। জনপ্রতিনিধির হাতে পিস্তল দেখার অভিজ্ঞতা এ দেশের মানুষের আগেও হয়েছে — কখনো ফুটবল মাঠে, কখনো রাজনৈতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে, কখনো নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তাপে।
সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়ের বিরুদ্ধে খেলার মাঠে পিস্তল নিয়ে ঢুকে রেফারিকে শাসানোর অভিযোগ উঠেছিল। একসময় জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিলেন জয়। প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের সঙ্গে এই ঘটনাও উঠে আসে। জয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধু ফুটবল মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না — মন্ত্রণালয়ে ভাঙচুর, পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে অসদাচরণসহ নানা ঘটনায় তার নাম এসেছিল সংবাদমাধ্যমে। আশুলিয়ায় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরিও হয়েছিল।
আর পিস্তলের রাজনীতির ইতিহাসে ক্যাপ্টেন (অব.) গিয়াস উদ্দিন আহমেদের নাম আলাদা অধ্যায়ের দাবি রাখে। ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের সাবেক এই আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য একসময় 'পিস্তল এমপি' হিসেবেই পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। ২০১২ সালের মে মাসে গফরগাঁওয়ের কান্দিপাড়া বাজারে তার গাড়িকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি নিজের আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি ছোড়েন। তবে গিয়াসের দাবি ছিল, একদল সশস্ত্র লোক তার গাড়িতে হামলা চালালে জীবন বাঁচাতে তিনি ফাঁকা গুলি ছুড়েছিলেন।
গিয়াসের ঘটনা আর ইশরাকের সাম্প্রতিক ঘটনা পাশাপাশি রাখলে একটি মিল চোখে পড়ে — দুজনের ঘটনাতেই আত্মরক্ষার যুক্তি সামনে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জনপ্রতিনিধির নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা থাকার পরও কেন জনসমক্ষে অস্ত্র ব্যবহার বা প্রদর্শনের প্রয়োজন পড়ে? আর এমন পরিস্থিতি সত্যিই তৈরি হলে তার আইনি মূল্যায়ন করবে কে — সংশ্লিষ্ট রাজনীতিক নিজে, নাকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্ত্রকাণ্ডের সবচেয়ে গুরুতর অধ্যায়গুলোর একটি জড়িয়ে আছে সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য ডা. এইচবিএম ইকবালের নামের সঙ্গে। ২০০১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মালিবাগে বিএনপির মিছিলে গুলির ঘটনায় চারজন নিহত হন। পরদিন সংবাদপত্রে মিছিলের ভেতর থেকে পিস্তল দিয়ে গুলি করার ছবি প্রকাশিত হয়েছিল। ওই মামলায় ইকবালসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে ২০০২ সালে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে হাইকোর্ট ইকবাল ও আরও ১৪ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার আদেশ স্থগিত করে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন।
ইকবালের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক পিস্তলকাণ্ড সব সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় শেষ হয় না। কখনো তার পরিণতি হয় প্রাণহানি, মামলা, বিচার এবং বছরের পর বছর ধরে চলা আইনি লড়াই।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অস্ত্রের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক নতুন নয়। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক সহিংসতা, দলীয় কোন্দল, নির্বাচনী সংঘাত এবং প্রভাব বিস্তারের ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার আলোচনায় এসেছে।
ইশরাকের সাম্প্রতিক ঘটনায় আবার সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। তিনি যে উদ্দেশ্যেই গেন্ডারিয়ায় গিয়ে থাকুন, প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে তার উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। মাদক প্রতিরোধ নিঃসন্দেহে জরুরি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের পদ্ধতিও আইনের মধ্যে থাকতে হবে। জনপ্রতিনিধি যদি নিজেই অভিযান পরিচালনা করেন, অস্ত্র প্রদর্শন করেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ধাওয়া করেন, তাহলে পুলিশ ও জনপ্রতিনিধির দায়িত্বের সীমানা কোথায় — এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
জয় থেকে গিয়াস, আর সর্বশেষ ইশরাক — সব ঘটনাকে একই মাত্রায় বিচার করা যায় না। কোথাও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ, কোথাও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্বীকার করা গুলি ছোড়ার ঘটনা, কোথাও ভাইরাল ভিডিও। প্রত্যেকটির আইনি অবস্থান ও প্রমাণের মাত্রা আলাদা। কিন্তু সবগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ সূত্র আছে — রাজনীতিতে আগ্নেয়াস্ত্রের উপস্থিতি এবং তা ঘিরে ক্ষমতার প্রদর্শন ও জবাবদিহির প্রশ্ন।
লাইসেন্স থাকা মানে যেমন প্রকাশ্যে অস্ত্র দিয়ে ভয় দেখানোর অবাধ অনুমতি নয়, তেমনি জনপ্রতিনিধি হওয়া মানে পুলিশের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকারও নয়। ইশরাকের মন্ত্রিত্ব হারানোর ঘটনা সেই সীমানার কথাই আবার মনে করিয়ে দিল। এখন দেখার বিষয়, গেন্ডারিয়ার ঘটনায় পুলিশের তদন্তে কী উঠে আসে এবং এই বিতর্ক রাজনৈতিক অঙ্গনে আর কোন দিকে মোড় নেয়।






