আট মাসে জ্বালানি খাতে ৪১২ কোটি ডলারের ভর্তুকি, জানালেন অর্থ উপদেষ্টা তিতুমীর
গত আট মাসে জ্বালানি খাতে ৪১২ কোটি ডলার ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। দেশের অর্থনীতির বর্তমান চাপের একটি বড় চিত্রই এই অঙ্কের মধ্য দিয়ে সামনে এল।
সোমবার দুপুরে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ আয়োজিত ইএসজি ড্যাশবোর্ড উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, দারিদ্র্য পরিস্থিতি ও সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন অর্থ উপদেষ্টা।
তিতুমীর বলেন, অতীত সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে এই সংখ্যা ৫ শতাংশ কমবে বলে সরকার আশা করছে বলে জানান তিনি।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিয়ে তিনি আরও বলেন, সরকারের ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে ৬০ শতাংশ দারিদ্র্য নিরসন করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ সামাজিক সুরক্ষাকে সরকার দারিদ্র্য কমানোর প্রধান হাতিয়ারগুলোর একটি হিসেবে দেখছে।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ২০২৯ সালে বাংলাদেশ চূড়ান্তভাবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ করে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই উত্তরণের প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে আগের সরকার কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ কারণে প্রস্তুতির জন্য তিন বছর সময় রাখা হয়েছে বলে জানান এই উপদেষ্টা। এলডিসি উত্তরণের পর বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে যে পরিবর্তন আসবে, তার জন্য এই প্রস্তুতির সময়টাকেই সরকার কাজে লাগাতে চায়।
সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তুলে ধরে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কর না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধি এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে সক্ষম ও সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়তে কাজ করছে সরকার।
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে ১৯৭৫ সালের সংকটের তুলনা করে তিনি বলেন, সে সময়ের মতো এখনো অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এই তুলনার মধ্য দিয়ে সংকটের গভীরতাই বোঝাতে চেয়েছেন তিনি।
সরকারের সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন অর্থ উপদেষ্টা। সেগুলো হলো উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং কর্মসংস্থানের সংকট।
কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তাঁর ভাষায়, জুলাই সনদ এসেছে, কিন্তু শিক্ষিত ব্যক্তিরা কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও চাকরির বাজারের সংকট কাটেনি — এই বাস্তবতাই তিনি তুলে ধরেছেন।
জ্বালানি খাতে আট মাসে ৪১২ কোটি ডলার ভর্তুকির হিসাবটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই বিপুল ব্যয় সরকারের বাজেটের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম ধরে রাখতে গিয়ে এই ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বলেই সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপকদের সামনে ভারসাম্যের কঠিন প্রশ্ন থাকে।
বিজিএমইএর ইএসজি ড্যাশবোর্ড উদ্বোধনের মতো একটি শিল্প-সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানে অর্থ উপদেষ্টার এই বক্তব্য ব্যবসায়ী মহলের জন্যও বার্তা বহন করে। উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সরকার অগ্রাধিকার বলায় রপ্তানিমুখী শিল্পের উদ্যোক্তারা সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়নের দিকেই তাকিয়ে থাকবেন।
সব মিলিয়ে অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্যে একদিকে যেমন ভঙ্গুর অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান সংকটের স্বীকারোক্তি রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যে ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা।
এখন দেখার বিষয়, জ্বালানি ভর্তুকির এই চাপ সামলে সরকার তার ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো কতটা বাস্তবায়ন করতে পারে এবং দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থান নিয়ে দেওয়া আশ্বাসগুলো মাঠে কতটা প্রতিফলিত হয়।




