তহবিল সংকটে গাজায় সাহায্য কমাল বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, সহায়তা হারাচ্ছেন পাঁচ লাখ ফিলিস্তিনি
তহবিল সংকটের কারণে গাজায় নিজেদের কার্যক্রমে বড় ধরনের কাটছাঁটের ঘোষণা দিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হবেন, এমন এক সময়ে যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের বড় অংশের মানুষ পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছেন।
সোমবার এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের এই সংস্থা জানায়, ২০২৬ সালে ফিলিস্তিনে তাদের কার্যক্রমের জন্য আগের বছরগুলোর তুলনায় অর্ধেকেরও কম তহবিল পেয়েছে তারা। আগামী ছয় মাসে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জরুরি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে আরও ৪৫ কোটি ডলার জরুরিভাবে প্রয়োজন বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।
এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে মাসিক সহায়তার পরিসরে। ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, গাজায় মাসিক সহায়তা পাওয়া মানুষের সংখ্যা ১৬ লাখ থেকে কমিয়ে ১১ লাখে নামিয়ে আনা হবে। অর্থাৎ প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ এই সহায়তার বাইরে চলে যাচ্ছেন।
শুধু উপকারভোগীর সংখ্যাই নয়, কমছে রেশনের পরিমাণও। পরিবারপ্রতি দুটি খাদ্য পার্সেলের বদলে এখন দেওয়া হবে একটি করে পার্সেল, আর আটার বস্তার আকারও ছোট করা হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
গরম খাবার বিতরণেও কাটছাঁট আসছে। প্রতিদিন আড়াই লাখ গরম খাবারের বদলে এখন দেওয়া হবে দেড় লাখ। দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলো — যার মধ্যে ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণের সীমানা হিসেবে পরিচিত তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’-র কাছাকাছি এলাকার পরিবারও রয়েছে — প্রতিদিনের বদলে এক দিন পর পর গরম খাবার পাবেন।
ডব্লিউএফপি সতর্ক করেছে, তহবিল ঘাটতি খাদ্য নিরাপত্তায় অর্জিত অগ্রগতিকে উল্টে দেওয়ার হুমকি তৈরি করেছে। সংস্থাটির ভাষায়, সাম্প্রতিক অগ্রগতি ‘সামান্য ও ভঙ্গুর’ — এই ভঙ্গুর অগ্রগতিই এখন ঝুঁকির মুখে।
প্রেক্ষাপট হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর শুরু হওয়া তিন বছরের বেশি সময়ের যুদ্ধে গাজায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। খাবার, পানি, আশ্রয়সহ মৌলিক প্রয়োজন মেটানো সেখানে প্রতিদিনের সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এই যুদ্ধে ৭৪ হাজার ২৪৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘের হিসাবে, গাজার ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ বেকার এবং তাজা বা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার পাওয়া গেলেও তা কেনার সামর্থ্য তাদের নেই।
শিশুদের অবস্থা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে মাত্র একজন পর্যাপ্ত বৈচিত্র্যময় খাবার খেতে পারছে, আর স্বাস্থ্যসেবার সুযোগও সীমিত রয়ে গেছে বলে জাতিসংঘের তথ্যে উঠে এসেছে।
বর্তমানে গাজায় প্রায় ১৪ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৬৭ শতাংশ, সংকট বা তার চেয়ে খারাপ মাত্রার তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তায় ভুগছেন। ২০২৫ সালের শেষে এই সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ বা জনসংখ্যার ৭৭ শতাংশ — সেই তুলনায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ডব্লিউএফপি বলছে, এই উন্নতি এখনো সামান্য ও ভঙ্গুর।
তহবিল ঘাটতির প্রভাব শুধু গাজাতেই সীমাবদ্ধ নয়। অধিকৃত পশ্চিম তীরেও সেপ্টেম্বরে সহায়তা পাওয়া মানুষের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে — চার লাখ থেকে দুই লাখে।
সব মিলিয়ে ডব্লিউএফপির বার্তা স্পষ্ট: জরুরি ভিত্তিতে নতুন তহবিল না এলে গাজা ও পশ্চিম তীরে মানবিক সহায়তা আরও সংকুচিত হবে, আর খাদ্য নিরাপত্তায় যে সামান্য অগ্রগতি এসেছে, তা-ও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।






