আইপিও ছাড়াই সরাসরি তালিকাভুক্তির পথ খুলল: ডাইরেক্ট লিস্টিং বিধিমালার গেজেট প্রকাশ
প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ছাড়াই ভালো ও যোগ্য বৃহৎ সরকারি-বেসরকারি কোম্পানিগুলোর শেয়ারবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ তৈরি করে গেজেট প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক এক্সচেঞ্জে সিকিউরিটিজের ডাইরেক্ট লিস্টিং) বিধিমালা, ২০২৬’ নামের এই বিধিমালার মাধ্যমে সরাসরি তালিকাভুক্তির আনুষ্ঠানিক কাঠামো কার্যকর হলো।
গত ১৩ অক্টোবর বিধিমালাটি জারি করা হয়। রোববার (১৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় এটি প্রকাশিত হয়েছে, আর গেজেট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বিধিমালাটি কার্যকর হয়েছে।
এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর বিএসইসির ১০২৭তম কমিশন সভায় চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে খসড়াটি অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীতে খসড়াটির ওপর সাধারণ বিনিয়োগকারী, বাজার মধ্যস্থতাকারী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছ থেকে লিখিত মতামত নেয় কমিশন। সবার মতামতের ভিত্তিতেই নতুন বিধিমালাটি চূড়ান্ত করে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।
নতুন বিধিমালায় সরকারি ও বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, বড় শিল্পগোষ্ঠী, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি এবং নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্য সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এ জন্য কোম্পানিকে অন্তত পাঁচ বছর ব্যবসা পরিচালনা, আগের দুই অর্থবছরে মূল ব্যবসা থেকে মুনাফা অর্জন এবং সর্বশেষ অর্থবছরে পরিচালন কার্যক্রম থেকে ইতিবাচক নগদ প্রবাহসহ বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে হবে।
যোগ্যতার শর্ত অনুযায়ী, সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য আবেদনকারী কোম্পানিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হতে হবে এবং কোম্পানিটির বার্ষিক টার্নওভার বা বিক্রয় আয় হতে হবে অন্তত এক হাজার কোটি টাকা। সম্পূর্ণ বা অন্তত ৫১ শতাংশ বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানি এবং সম্পূর্ণ বা অন্তত ৫১ শতাংশ সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিও এই সুযোগ পাবে। সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মালিকানা অন্তত ১০ শতাংশ রয়েছে, এমন কোম্পানিও যোগ্যতার আওতায় আসবে।
ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রে সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী নিট সম্পদ অন্তত ৫০০ কোটি টাকা হতে হবে। এ ছাড়া বিএসইসি নির্ধারিত অন্য কোনো কোম্পানিকেও সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ দেওয়া যাবে।
শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে বিধিমালায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোম্পানিকে মার্চেন্ট ব্যাংকারের সঙ্গে পরামর্শ করে শেয়ারের একটি রেফারেন্স মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। এই মূল্যায়নে অন্তত দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে — একটি পরম মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং অন্যটি আপেক্ষিক মূল্যায়ন পদ্ধতি। কোম্পানির ব্যবসার ধরন ও খাত বিবেচনায় পদ্ধতি নির্বাচন করতে হবে এবং সেই নির্বাচনের যৌক্তিকতা প্রকাশ করতে হবে।
রেফারেন্স মূল্য নির্ধারণের পর শেয়ার বিক্রির ন্যূনতম প্রস্তাবমূল্য বা ‘মিনিমাম আস্কিং প্রাইস’ ওই মূল্যের অন্তত ২৫ শতাংশ কম রাখতে হবে। অর্থাৎ কোনো কোম্পানির রেফারেন্স মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারিত হলে ন্যূনতম প্রস্তাবমূল্য হতে হবে ৭৫ টাকা বা তার কম। তবে এটি শেয়ারের চূড়ান্ত বাজারদর নয় — প্রথম দিনের মূল্য আবিষ্কার পর্বে বিনিয়োগকারীদের দরপ্রস্তাবের ভিত্তিতে বাজারদর নির্ধারিত হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে কোম্পানির অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার বাজারে ছাড়তে হবে।
বিধিমালা অনুযায়ী, তালিকাভুক্তির পর উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ৩০ শতাংশ শেয়ার ধরে রাখতে হবে এবং এই মালিকানা পরবর্তী সময়েও বজায় রাখতে হবে। অন্যদিকে, সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বিক্রির জন্য নির্ধারিত মোট শেয়ারের সর্বোচ্চ ১ শতাংশ কোনো একক ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী কিনতে পারবেন। বিক্রির জন্য নির্ধারিত শেয়ারের অন্তত ১০ শতাংশ প্রথম লেনদেন দিবস থেকে ৩০ লেনদেন দিবসের মধ্যে বিক্রি করতে হবে।
প্রথম দিনের লেনদেনের জন্য বিশেষ নিয়ম রাখা হয়েছে। শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে দুই ঘণ্টার মূল্য আবিষ্কার পর্ব থাকবে — এ সময়ে বিনিয়োগকারীরা ক্রয়াদেশ দিতে পারবেন, তবে বিক্রেতারা কোনো বিক্রয়াদেশ দিতে পারবেন না, আর ন্যূনতম প্রস্তাবমূল্যের নিচে কোনো ক্রয়াদেশ গ্রহণ করা হবে না। মূল্য আবিষ্কার পর্ব শেষে বিক্রেতারা বাজারে পাওয়া সর্বোত্তম দরে শেয়ার বিক্রির আদেশ দিতে পারবেন। প্রথম দিন শেয়ারের ওপর কোনো সার্কিট ব্রেকার কার্যকর হবে না। প্রথম দুই লেনদেন দিবসে একক আদেশে ১০০টির কম বা এক হাজারের বেশি শেয়ার কেনার আদেশও গ্রহণ করা হবে না।
আরও কিছু বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে বিনিয়োগকারী সুরক্ষায়। সরাসরি তালিকাভুক্তির প্রথম দিন থেকে এক বছর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিক্রেতারা ওই কোম্পানির শেয়ার কিনতে পারবেন না। তালিকাভুক্তির সময় হাতে থাকা শেয়ারের ৫০ শতাংশের বেশি বিক্রির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিধিনিষেধ থাকবে।
আবেদন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে, তালিকাভুক্তির আবেদন করতে এক লাখ টাকা ফি দিতে হবে। আবেদন পাওয়ার ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে স্টক এক্সচেঞ্জকে কোনো ঘাটতি থাকলে তা জানাতে হবে, আর সব শর্ত পূরণের পর ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দিতে হবে। অনুমোদিত তথ্য বিবরণী প্রথম লেনদেন শুরুর অন্তত ১০ দিন আগে প্রকাশ করতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির আর্থিক ও অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
নতুন বিধিমালার মাধ্যমে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ২০১৫ সালের তালিকাভুক্তি প্রবিধানমালায় থাকা ডাইরেক্ট লিস্টিং-সংক্রান্ত ৮ থেকে ১৩ নম্বর প্রবিধান বাতিল করা হয়েছে। ফলে সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে এখন থেকে নতুন বিধিমালার শর্তই অনুসরণ করতে হবে — আর বড় ও যোগ্য কোম্পানিগুলোর বাজারে আসার এই নতুন পথ কতটা সাড়া ফেলে, সেদিকেই এখন বাজারসংশ্লিষ্টদের নজর।



