কক্সবাজারের রিসোর্টে আগুনে ১০ জনের মৃত্যু, জানালা ভেঙে লাফিয়ে বাঁচলেন মেহেরুননেসা, স্বজনদের পুড়ে মরতে দেখলেন দূর থেকে
কক্সবাজারের ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতে একটি রিসোর্টে আগুনে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনায় বেঁচে যাওয়া মেহেরুননেসা মিলা এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। আগুন থেকে বাঁচতে জানালা ভেঙে লাফিয়ে পড়েছিলেন তিনি ও তাঁর স্বামী মাসুদ মিয়া; দুজনই গুরুতর আহত হন। এরপর দূরে দাঁড়িয়ে তাঁদের চোখের সামনে রিসোর্টের ভেতরে স্বজনেরা পুড়ে মারা যান।
গত শুক্রবার সকালে টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। রোববার পর্যন্ত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। স্বজনদের দাবি অনুযায়ী একজনের খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি। নিহতদের মধ্যে ছয়জন রাজধানীর খিলগাঁওয়ের পশ্চিম নন্দীপাড়ার বাসিন্দা মেহেরুননেসার স্বজন; বাকি চারজন যশোরের একই পরিবারের সদস্য বলে স্বজনেরা দাবি করেছেন।
মেহেরুননেসা সেদিনের বর্ণনায় জানান, তিনি, তাঁর স্বামী এবং আত্মীয় মালিহা ও মালিহার স্বামী আশিকুর এক ঘরে ছিলেন। শনিবার ভোরের দিকে মালিহা পাশের ঘরে সবাইকে ঘুম থেকে ডাকতে যান। কিছুক্ষণ পর ধোঁয়ার গন্ধ পেয়ে মেহেরুননেসাও পাশের ঘরে গিয়ে আগুন দেখতে পান।
তিনি বলেন, বের হওয়ার পথ পাওয়া যাচ্ছিল না। স্বামী মাসুদ ও আশিকুরকে ডেকে তোলেন তিনি। মালিহা পাশের ঘরে ডাকতে গিয়ে আর ফিরতে পারেননি; ফেরার পথে ছিল আগুন। তখন পেছনের দিকে জানালার কাচ ভাঙার চেষ্টা করেও তাঁরা ব্যর্থ হচ্ছিলেন।
মেহেরুননেসা বলেন, বাঁচার আশা তিনি ছেড়েই দিয়েছিলেন; মনে হয়েছিল, মরার আগে হয়তো আর কাউকে দেখতে পাবেন না। শেষ পর্যন্ত একটি চেয়ার দিয়ে মাসুদ কাচ ভেঙে ফেলেন। প্রথমে তিনি লাফ দিতে গিয়ে ভাঙা কাচে হাত আটকে যান; স্বামী তাঁর হাত ছাড়িয়ে দেন। এরপর কোনো শক্ত বস্তুর ওপর পড়ে তাঁর বাঁ পায়ের মাংস ঝুলে যায়।
তিনি ও আশিক লাফিয়ে পড়ে আহত হন। পড়ে গিয়ে সেখান থেকে উঠতে পারছিলেন না তিনি। প্রায় দুই ঘণ্টা পর লোকজন তাঁদের উদ্ধার করেন। কিছুদূর হামাগুড়ি দিয়ে তিনি ধানখেতের ভেতরে চলে যান। তাঁর ভাষায়, আর কেউ বের হতে পারেনি; দূর থেকে স্বজনদের আগুনে পুড়ে মৃত্যু দেখেছেন তিনি।
শনিবার রাতে মেহেরুননেসা ও মাসুদ মিয়াকে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে নেওয়া হয়। মাসুদকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়, মেহেরুননেসাকে ভর্তি করা হয়। তিনি প্রিমিয়ার ব্যাংকের কলসেন্টারে চাকরি করেন, স্বামী মাসুদ একমি কোম্পানিতে কর্মরত; তাঁরা উত্তরায় থাকেন।
বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, মেহেরুননেসার দুই হাতে সামান্য আঘাত থাকলেও বাঁ পায়ের আঘাত বড়; পায়ের মাংস কেটে ঝুলে গেছে এবং সেখানে অস্ত্রোপচার লাগবে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম ওরফে সুমনের সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ। সোমবার আদালতে রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ও তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক রিমন ঘোষ বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সুমনের সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে; শনিবার সন্ধ্যায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শনিবার রাতে উখিয়া থানার উপপরিদর্শক আশীষ সূত্রধর মামলা করেন। মামলায় রিসোর্টের মালিক তানভীর আহমদ ও তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোর্শেদসহ ২৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।
নিহতদের পরিচয় শনাক্ত ও মরদেহ হস্তান্তরের জন্য ডিএনএ পরীক্ষার পথ নিয়েছে প্রশাসন। রোববার ঢাকায় সিআইডি সদর দপ্তরে নিহতদের সাতজন স্বজনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, স্বাভাবিকভাবে ডিএনএ প্রতিবেদন পেতে তিন থেকে চার সপ্তাহ লাগে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার পর মরদেহ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত প্রতিবেদন পাওয়ার চেষ্টা চলছে। উদ্ধার হওয়া ১০টি মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গের হিমাগারে রাখা হয়েছে; স্বজনদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপাতত ময়নাতদন্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এখন সবার অপেক্ষা ডিএনএ প্রতিবেদনের দিকে, যার পর স্বজনেরা প্রিয়জনদের মরদেহ বুঝে পাবেন।



