২২ শয্যার ওয়ার্ডে ১৪৫ শিশু রোগী: চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে বারান্দায় চলছে চিকিৎসা
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে শয্যা মাত্র ২২টি, অথচ ভর্তি রয়েছে ১৪৫ জন শিশু রোগী—ধারণক্ষমতার প্রায় সাত গুণ। শয্যা তো দূরের কথা, মেঝেতেও জায়গা না পেয়ে অনেক শিশুকে বারান্দায় বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
সোমবার দুপুর ১২টার দিকে হাসপাতাল ভবনের দোতলায় উঠতেই দেখা যায়, বারান্দায় বিছানা পেতে শিশুদের চিকিৎসাসেবা চলছে। পাশে উদ্বিগ্ন মুখে বসে আছেন তাদের স্বজনেরা। তাঁরা জানান, ওয়ার্ডের ভেতরে জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়েই তাঁদের সন্তানদের নিয়ে বারান্দায় থাকতে হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভর্তি থাকা শিশুদের মধ্যে ২০টি হামের উপসর্গ নিয়ে এসেছে; অন্যরা জ্বর, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। ধারণক্ষমতার প্রায় সাত গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকায় একদিকে রোগী ও স্বজনেরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন, অন্যদিকে এই চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
হাসপাতালের হিসাব বলছে, ১৩ থেকে ১৯ অক্টোবর—এই সাত দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ভর্তি হয়েছে ২৭ শিশু। একই সময়ে জ্বর, সর্দি-কাশিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশু ওয়ার্ডে নতুন ভর্তি হয়েছে ২৪১ শিশু। আর বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে ১ হাজার ৭৯২ শিশু। শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিন নতুন করে ৩৫ থেকে ৪০ জন শিশু ভর্তি হচ্ছে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, ঋতু পরিবর্তনের কারণেই শিশুদের সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্তের হার বেড়েছে। দিন-রাতের তাপমাত্রার হেরফেরে শিশুরা সহজে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তবে তাঁদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের শিশু কনসালট্যান্ট আসাদুর রহমান মালিক খোকন বলেন, ‘এখন আবহাওয়া পরিবর্তন হচ্ছে। এতে দিন-রাতে তাপমাত্রার হেরফেরের কারণে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এ সময়ে শিশুদের ঠান্ডা-কাশি, নিউমোনিয়া, হাম ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া বর্তমানে ২০টি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রয়েছে, যা উদ্বেগজনক।’
ওয়ার্ডে ভর্তি আড়াই বছর বয়সী শিশু সারার মা রুকাইয়ার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘চার দিন ধরে মেয়েকে নিয়ে সদর হাসপাতালে ভর্তি আছি। আমার মেয়ের হাম হয়েছে। তবে এখন সে আপাতত সুস্থ আছে। আজ (সোমবার) হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাসায় যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’ তাঁর মতো অনেক অভিভাবকই দিনের পর দিন হাসপাতালে থেকে সন্তানের সুস্থতার অপেক্ষায় আছেন।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ফারহানা ওয়াহিদ তানি বলেন, ‘সারা দেশের মতো চুয়াডাঙ্গাতেও হামের রোগী বেড়েছে। এর মধ্যে আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে শিশুরা ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি, যাতে আক্রান্ত রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া যায় এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। বর্তমানে আমাদের পর্যাপ্ত ওষুধের সরবরাহ রয়েছে।’
তবে সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। ফারহানা ওয়াহিদ তানি বলেন, ‘আমাদের লোকবল অনেক কম। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাবও রয়েছে। হাম একটি ছোঁয়াচে রোগ। তাই আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতে হবে।’
চিকিৎসকদের পরামর্শ, এই মৌসুমে শিশুদের ঠান্ডা থেকে সুরক্ষিত রাখা, হামের উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নেওয়া এবং আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা জরুরি। চাপ যতই থাকুক, সদর হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্সরা সীমিত জনবল নিয়েই শিশুদের সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন; তবে এই চাপ দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।




