অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ব্যাংকে একযোগে আড়াই হাজার চাকরি ছাঁটাই, নেপথ্যে প্রযুক্তির ঝড় ও মন্দা অর্থনীতি
অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম বড় ব্যাংক ন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়া ব্যাংক (এনএবি) একযোগে আড়াই হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে, যা ব্যাংকটির মোট কর্মীশক্তির ৬ শতাংশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিস্তারে বিশ্বজুড়ে ব্যাংকিং খাতে যে বড় রদবদল চলছে, এই ছাঁটাই তারই সর্বশেষ বড় উদাহরণ।
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এনএবি জানিয়েছে, ছাঁটাইয়ের বড় অংশই চলতি বছরের শেষের আগেই বাস্তবায়ন করা হবে। কারণ হিসেবে ব্যাংকটি উল্লেখ করেছে চ্যালেঞ্জিং অর্থনীতি, প্রতিযোগিতা এবং ‘দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন’।
এনএবির এই সিদ্ধান্ত খাতজুড়ে চলা ছাঁটাইয়ের ধারারই অংশ। গত বছর আরেক বড় ব্যাংক এএনজেড সাড়ে তিন হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছিল। বড় ব্যাংকগুলো একে একে জনবল কমিয়ে আনছে।
আরএমআইটির অর্থনীতির অধ্যাপক অ্যাঞ্জেল ঝং মনে করেন, এই পুনর্গঠন পুরো শিল্পখাতজুড়ে চলা এক ধরনের নতুন করে সাজানোর প্রক্রিয়া। তাঁর ভাষ্যে, ‘ব্যাংকগুলো প্রযুক্তি ও এআইয়ে প্রচুর বিনিয়োগ করছে এবং অনেক বেশি ডিজিটাল ব্যাংকিং মডেলের জন্য তাদের মূল কর্মীশক্তিকে নতুন করে ঢেলে সাজাচ্ছে।’
ঝং আরও বলেন, ‘এটি শুধু চক্রাকার ব্যয়সংকোচন নয়, এটি কাঠামোগত পরিবর্তন।’ অর্থাৎ অর্থনীতির সাময়িক মন্দা কাটলেও এই ধরনের পরিবর্তন ফিরে আসার সম্ভাবনা কম।
জুলাই মাসে প্রকাশিত একটি সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতের চাকরিগুলো এআইয়ের অগ্রগতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা পেশাগুলোর মধ্যে রয়েছে। প্রশাসনিক কাজ, প্রোগ্রামিং ও করণিক ধরনের তথাকথিত ‘জ্ঞানভিত্তিক’ ভূমিকাগুলোই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, জনমত ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার সংবেদনশীলতার কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ছাঁটাইয়ের ঘোষণায় সরাসরি এআইয়ের কথা খুব কমই উল্লেখ করে। এনএবির বিবৃতিতেও এআইয়ের নাম আসেনি, এসেছে ‘দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন’-এর কথা।
ব্যাংকটি বলেছে, এই পরিবর্তনগুলোর ফলে কাজের পুনরাবৃত্তি কমবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়বে। একই সঙ্গে পরামর্শক ও বাইরের ঠিকাদারদের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে এনএবির।
অস্ট্রেলিয়ার বড় ব্যাংকগুলোর ভাগ্য আবাসন বাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তাই তাদের এই কাঠামোগত রদবদলকে করপোরেট খাতজুড়ে আসন্ন ছাঁটাইয়ের স্পষ্ট ব্যারোমিটার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইতিমধ্যে দেশটির অর্থনীতি গতি হারাচ্ছে। বেকারত্বের হার বেড়ে ৪.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এমন সময়ে বড় ব্যাংকের এই ছাঁটাই চাকরিপ্রার্থীদের জন্য আরও দুশ্চিন্তা বাড়াবে।
শ্রমিক সংগঠন ফাইন্যান্স সেক্টর ইউনিয়নের জাতীয় সহকারী সচিব নিকোল ম্যাকফারসন বলেছেন, এনএবির ছাঁটাই ‘ইতিমধ্যে অসহনীয় কাজের চাপে জর্জরিত’ কর্মীশক্তির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। তাঁর ভাষ্যে, ‘এটি ব্যাংকটিতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে এবং উদ্বেগের সংস্কৃতিকে এমন এক ব্যাংকে আরও পাকাপোক্ত করবে, যেটি আত্মধ্বংসে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে।’



