পূজার প্যান্ডেল ভাঙচুরের দাবিতে ছড়ানো ভিডিও আসলে সাতক্ষীরার শামীম হত্যায় গ্রেপ্তার আমিনীর
দুর্গাপূজার প্যান্ডেল ও হিন্দু মন্দিরে এক মুসলিম ব্যক্তি হামলা চালিয়েছেন—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওর ব্যক্তি আসলে সাতক্ষীরার শামীম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভিডিওটির সঙ্গে পূজার প্যান্ডেল বা মন্দির ভাঙচুরের কোনো সম্পর্ক নেই।
‘জিতেন্দ্র প্রতাপ সিং’ নামের একটি এক্স অ্যাকাউন্টে গত ১৮ অক্টোবর ভিডিওটি শেয়ার করা হয়। ইংরেজি ক্যাপশনে দাবি করা হয়, বাংলাদেশে দুর্গাপূজার একটি প্যান্ডেল ও একটি হিন্দু মন্দিরে ভাঙচুর চালিয়েছেন ওই ব্যক্তি এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এক্সে শেয়ার করা ভিডিওটি এরই মধ্যে প্রায় দেড় লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে। ভিডিওটিতে দুই হাজারের ওপর প্রতিক্রিয়াও পড়েছে, যা থেকে বোঝা যায় দাবিটি দ্রুত বহু মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ সদস্যদের মাঝে হাতকড়া পরা এক ব্যক্তিকে দেখা যায়। ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিতে তিনি অপরাধী, তবে আল্লাহর দৃষ্টিতে তিনি কী—সেটা আল্লাহই ভালো জানেন। অপরাধবোধ কাজ করছে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘না।’
একই ভিডিওতে তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন দেশের নাস্তিকদের কাছ থেকে পাওয়া ফোনকলে হুমকির মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নাস্তিক ছিলেন এবং তাঁকে মারার আসলে কোনো উপায় ছিল না, ঘটনাটি ‘দুর্ঘটনাক্রমে’ ঘটে গেছে। ভিডিওর পেছনে ‘সাতক্ষীরা থানা’ লেখা দেখা যায়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রচারিত ভিডিওর কথোপকথনে কোথাও দুর্গাপূজা, মণ্ডপ কিংবা মন্দির ভাঙচুরের কোনো কথা নেই। বরং বক্তব্যের ধরন থেকেই বোঝা যায়, এটি অন্য একটি ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তির বক্তব্য।
ভিডিওর বক্তব্য ধরে অনুসন্ধানে সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে গত ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত একটি ভিডিও প্রতিবেদনের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর দৃশ্যগত মিল পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, সাতক্ষীরার দেবহাটায় গণপিটুনিতে শামীম হত্যা মামলার প্রধান আসামি আমিনী গ্রেপ্তার।
জাতীয় দৈনিক আজকের পত্রিকায় ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকেও ঘটনার বিস্তারিত মেলে। সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গণপিটুনিতে ওয়াহেদুজ্জামান সানা ওরফে শামীম (৩৮) নামের এক যুবক নিহত হন।
ওই হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে গত ১৭ অক্টোবর রাতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার সময় আমিনী দাবি করেন, শামীম নাস্তিক ছিলেন এবং তাঁকে হত্যার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না, ঘটনাটি ‘দুর্ঘটনাক্রমে’ ঘটে গেছে।
বিচারকের সামনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি আরও বলেন, আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী হলেও আল্লাহর দৃষ্টিতে তিনি কী, তা আল্লাহই ভালো জানেন। এক্সে ছড়ানো ভিডিওর বক্তব্য হুবহু এই জবানবন্দি-পরবর্তী বক্তব্যের সঙ্গেই মিলে যায়।
অতএব, বাংলাদেশে দুর্গাপূজার প্যান্ডেল ও মন্দিরে ভাঙচুর চালিয়ে এক মুসলিম ব্যক্তি গ্রেপ্তারের পর গণমাধ্যমের সামনে হাসছেন—এমন দাবিটি ভিত্তিহীন। মূলত সাতক্ষীরার দেবহাটায় গণপিটুনিতে যুবক নিহতের ঘটনায় গ্রেপ্তার প্রধান আসামির সাক্ষাৎকারকেই ভিন্ন দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে।
উৎসবের মৌসুমে এ ধরনের ভুল দাবি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে। তাই কোনো ভিডিও শেয়ার করার আগে তার প্রকৃত প্রেক্ষাপট যাচাই করা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে।






