ইউক্রেনকে ইচ্ছা করে বঞ্চিত করছে না যুক্তরাষ্ট্র, জেলেনস্কির অভিযোগ নাকচ রুবিওর
ইউক্রেনকে ইচ্ছাকৃতভাবে সামরিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত করার কোনো নীতি যুক্তরাষ্ট্র নেয়নি বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহে বিলম্ব নিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির অভিযোগের জবাবে মঙ্গলবার ভারত সফরকালে তিনি এ কথা বলেন।
রুবিও বলেন, রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কবার্তা ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি এবং পেন্টাগন ইচ্ছা করে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র আটকে রাখছে না। তাঁর ভাষায়, ‘ইউক্রেনকে ইচ্ছা করে কোনো কিছু থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে না।’ যুক্তরাষ্ট্র আগাম সতর্কবার্তা দিচ্ছে না বলে যেসব খবর বেরিয়েছে, সেগুলোকে তিনি ‘জঘন্য’ বলে অভিহিত করেন।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের নীতির প্রসঙ্গে রুবিও বলেন, ‘ইউক্রেনের ক্ষেত্রে তারা যা যা করে আসছে, সবই আগের মতোই আছে। কিছুই বদলায়নি।’ অর্থাৎ ওয়াশিংটনের দাবি, কিয়েভের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার ধরনে কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনা হয়নি।
তবে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের জরুরি চাহিদার ক্ষেত্রে রুবিও বাস্তব সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইউক্রেনের চাহিদার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের প্রয়োজন এবং অন্যান্য মিত্রদের চাহিদার ভারসাম্য রাখতে হচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এখন মজুত পুনরায় ভরার চেষ্টা করছে।
রুবিও বলেন, ‘আমি জানি, প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলছেন, তার একটি হলো তিনি ইন্টারসেপ্টর কেনার চেষ্টা করছেন। আমি সেটা বুঝি। পৃথিবীর প্রতিটি দেশই তাই করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজ সৌদি আরবের সঙ্গেও কথা বলেছি। তারাও ইন্টারসেপ্টর চায়। ইসরায়েলও ইন্টারসেপ্টর চায়। আমরাও ইন্টারসেপ্টর চাই। পৃথিবীর প্রতিটি দেশই ইন্টারসেপ্টর চায়।’
এর আগে সোমবার মার্কিন আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে দেওয়া এক ভিডিও ব্রিফিংয়ে জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, ন্যাটো-নেতৃত্বাধীন ‘প্রায়োরিটাইজড ইউক্রেন রিকোয়ারমেন্টস লিস্ট’ (পিইউআরএল) কর্মসূচির আওতায় মিত্ররা অর্থ পরিশোধ করে দিলেও পেন্টাগন ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহে দেরি করছে। তাঁর ভাষায়, ‘দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের অংশীদাররা পিইউআরএল কর্মসূচির মাধ্যমে অর্থ দিলেও পেন্টাগন সেই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো পাঠাতে দেরি করছে।’
জেলেনস্কি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সব সময় ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষকে আসন্ন রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সম্পর্কে সতর্ক করে না। অথচ এ ধরনের হামলা এখন আরও ঘন ঘন হচ্ছে এবং ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে মানুষ মারা যাচ্ছে।
তাঁর ভাষায়, ‘দুর্ভাগ্যবশত, গত রাতের রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রথম ঢেউ সম্পর্কে আমরা অংশীদারদের কাছ থেকে আগাম সতর্কবার্তা পাইনি। আর সামনের সারির বিভিন্ন খাতে স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড সেবায় গতির সীমাবদ্ধতার মুখেও আমরা আছি। এই দুটি বিষয়ের কোনোটা নিয়েই মার্কিন পক্ষ ইউক্রেনকে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।’
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, মার্কিন আগাম সতর্কব্যবস্থা ‘সব সময় কাজ করত, তারপর হঠাৎ করেই তা বিকল হয়ে গেল। ইউক্রেনে কেউই এটা বিশ্বাস করে না।’ তাঁর দাবি, আমেরিকানরা প্রথমে বলেছিল আবহাওয়ার কারণে এমন হয়েছে, তারপর বলেছে সফটওয়্যার বিকল হয়েছিল, তারপর অন্য কিছু — কিন্তু কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা তারা দেয়নি।
রুবিও অবশ্য বলেন, ১৩ ও ১৮ অক্টোবর রুশ ক্ষেপণাস্ত্র সম্পর্কে তথ্য পেতে ইউক্রেনের কেন সমস্যা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র তা খতিয়ে দেখছে। তাঁর মতে, ‘সম্ভবত এটি তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ছিল — যে তথ্য দেওয়া হচ্ছিল, তা তারা ব্যবস্থায় ফেলে তার ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারছিল না।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমার মনে হয়, এখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটা হলো — ইউক্রেনের ক্ষতি করার জন্য ইচ্ছাকৃত কোনো রাজনৈতিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।’ অর্থাৎ ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো, যা ঘটেছে তা কারিগরি বা অভ্যন্তরীণ জটিলতা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়।
ইউক্রেনের আরেকটি অভিযোগ হলো, ইলন মাস্কের স্টারলিংক তাদের ইন্টারনেট সংযোগের গতি কমিয়ে দিয়েছে, যার ফলে রুশ ড্রোন আটকানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রযুক্তিনির্ভরতা যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, বিতর্কটি আবার তা সামনে এনেছে।
মঙ্গলবার জেলেনস্কি জানান, তিনি এসব বিষয় রুবিওর কাছে তুলেছেন। তিনি বলেন, সাহায্য করার ইচ্ছা এবং স্পষ্ট অবস্থানের জন্য তিনি রুবিওর প্রতি কৃতজ্ঞ। প্রথম বিষয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে ইন্টারসেপ্টর — অর্থাৎ কিয়েভের সবচেয়ে জরুরি চাহিদাটাই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল।
সব মিলিয়ে, ইউক্রেনের অভিযোগ আর ওয়াশিংটনের অস্বীকৃতির এই পাল্টাপাল্টি রুশ আগ্রাসনের চার বছরের মাথায় এসে দুই মিত্রের সম্পর্কে বাড়তে থাকা টানাপোড়েনেরই প্রতিচ্ছবি। আগাম সতর্কব্যবস্থার ত্রুটির তদন্তের ফল এবং ইন্টারসেপ্টর সরবরাহের গতি এখন নির্ধারণ করবে, এই দূরত্ব কারিগরি ব্যাখ্যায় মিটবে নাকি আরও বাড়বে।




