চকলেটের অপেক্ষায় রিদিতা-সাইফান, নাটোরের দুর্ঘটনায় জাজিরার পাঁচ ব্যবসায়ীর ঘরে নেমেছে শোক
মঙ্গলবার ভোরে নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১৪ জনের মধ্যে পাঁচজনই শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার ব্যবসায়ী। জীবিকার সন্ধানে একসঙ্গে ঘর ছেড়েছিলেন তাঁরা; ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে। পাঁচটি পরিবারে এখন শুধুই শোক আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া এলাকায় নাটোর-পাবনা মহাসড়কের সরকারপাড়া অংশে বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান জুয়েলসহ জাজিরার পাঁচ ব্যবসায়ী। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোরে ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনায় মোট ১৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩০ জন।
এই পাঁচজনের একজনের গল্পই এখন সবাইকে কাঁদাচ্ছে। চার বছরের রিদিতা ও দুই বছরের সাইফান এখনো জানেন না, তাদের বাবা আর ফিরবেন না। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে আদর করে গিয়েছিলেন বাবা জুয়েল মাদবর; কথা দিয়েছিলেন, ফেরার পথে তাদের জন্য চকলেট নিয়ে আসবেন। ছোট্ট দুই শিশুর কাছে বাবার সেই প্রতিশ্রুতিই ছিল আনন্দের অপেক্ষা। কিন্তু পরদিন সকালে এলো মৃত্যুর খবর।
আগের রাতে বড় ভাই শাহজাহান মাদবরকে ফোন করেছিলেন জুয়েল। জানিয়েছিলেন, ব্যবসার কাজে নাটোর যাবেন। সবাই মিলে পদ্মা সেতুর গোড়া থেকে বাসে উঠবেন, গন্তব্য রাজশাহীর তাহেরপুর; সেখান থেকে ভুট্টাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য কিনে আনবেন। কথাবার্তা ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। কে জানত, ভাইয়ের সঙ্গে সেটিই হয়ে থাকবে তাঁর জীবনের শেষ কথোপকথন!
শাহজাহান মাদবর বলেন, ‘গত রাতে জুয়েল আমাকে ফোন দিয়ে বলেছিল, ভুট্টা কিনতে নাটোর যাবে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কীভাবে যাবি? সে বলেছিল, সবাই একসঙ্গে পদ্মা সেতুর গোড়া থেকে বাসে উঠবে। এরপর সকালে ফোন পাই, আমার ভাই নাটোরে মারা গেছে। রাতে যে ভাইয়ের সঙ্গে কথা হলো, সকালে শুনলাম সে আর নেই।’
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নের সেই বাড়িতে এখন স্বামীর শোকে স্তব্ধ মৌসুমী আক্তার। আর রিদিতা-সাইফানের কাছে বাবার অনুপস্থিতির অর্থ এখনো পরিষ্কার নয়। তারা মায়ের কাছে জানতে চায়, ‘বাবা কই, মা কখন আসবে?’ বড়দের জানা, সেই অপেক্ষার আর কোনো সমাপ্তি নেই।
প্রায় দুই যুগ ধরে জাজিরার কাজিরহাট এলাকায় ব্যবসা করতেন জুয়েল মাদবর। ভুসামালের ব্যবসার পাশাপাশি রড-সিমেন্টের ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে স্থানীয় বাজারে পরিচিতি গড়ে উঠেছিল তাঁর। প্রায় এক বছর আগে জুয়েলের বাবাও মারা যান। সেই শোক কাটিয়ে পরিবার যখন আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিল, তখনই এ দুর্ঘটনা কেড়ে নিল পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটিকে।
জুয়েলের সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন জাজিরা উপজেলার আরও চার ব্যবসায়ী। তাঁরা হলেন ডুবিসায়বর মোল্যাকান্দি এলাকার সালাল মোল্যা, ডুবিসায়বর কাজিরহাট এলাকার সোহাগ শিকদার, কাজিরহাট এলাকার সামাদ ফকির এবং পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া এলাকার শাহিন বেপারী।
সালাল মোল্যা ছিলেন জাহান উদ্দিন মোল্যার ছেলে। সোহাগ শিকদার ছিলেন ইউনুস শিকদারের ছেলে। শাহিন বেপারী ছিলেন রাজ্জাক বেপারীর ছেলে। সামাদ ফকির কাজিরহাট এলাকার ভুসামাল ব্যবসায়ী ছিলেন। শাহিন বেপারী যুক্ত ছিলেন হলুদের ব্যবসায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত পাঁচজনই জাজিরার কাজিরহাট ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করতেন। ব্যবসার প্রয়োজনে তাঁরা রাজশাহীর তাহেরপুরে যাচ্ছিলেন। সেখানে ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়াসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য কেনার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। এই পাঁচ ব্যবসায়ীর আয়েই চলত তাঁদের সংসার; তাঁদের ঘিরেই ছিল স্ত্রী-সন্তানদের স্বপ্ন আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।
দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া আলমগীর মাদবরের ভাষ্য অনুযায়ী, যাত্রাবিরতির পর বাসটি অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলছিল। তাঁর দাবি, চালককে তন্দ্রাচ্ছন্ন মনে হওয়ায় যাত্রীরা তাঁকে সতর্ক করেছিলেন এবং গতি কমানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন। পরে বাসটির সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
একই এলাকার পাঁচ ব্যবসায়ীর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে জাজিরার কাজিরহাট ও আশপাশের এলাকায়। জীবিকার প্রয়োজনে একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেছিলেন তাঁরা, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই থেমে গেছে তাঁদের পথচলা। পেছনে পড়ে রয়েছে অপেক্ষায় থাকা পরিবার, অসমাপ্ত স্বপ্ন আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
স্বজন হারানোর বেদনার পাশাপাশি নিহতদের পরিবারগুলোর পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল-ইমরান পরিবারগুলোর পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে তাৎক্ষণিক সহযোগিতার আশ্বাসের বাইরেও পরিবারগুলোর সামনে রয়েছে দীর্ঘ পথ—যাঁদের উপার্জনে সংসার চলত, তাঁদের হারিয়ে দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো থেকে সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা, সবকিছুই এখন নতুন করে ভাবতে হবে স্বজনদের।
সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানের বাইরে প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে যে আলাদা একটি সংসার, অসংখ্য স্মৃতি ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা জড়িয়ে থাকে, এই ঘটনাও তার নির্মম উদাহরণ। জুয়েল হয়তো ভেবেছিলেন, ব্যবসা থেকে ফিরে সন্তানদের হাতে চকলেট তুলে দেবেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি অপূর্ণই থেকে গেল—রিদিতা আর সাইফানের শৈশবে বাবার জন্য অপেক্ষার জায়গাটি হয়ে থাকবে এক গভীর, অপূরণীয় শূন্যতা।



