হরমুজ প্রণালিতে আবার নৌ-মাইনের আতঙ্ক, দুই ট্যাংকারে আগুনের দাবি ইরানের; চুক্তির আহ্বান তেহরানের
হরমুজ প্রণালিতে আবার ফিরে এসেছে নৌ-মাইনের হুমকি। ইরানের দাবি, ১৭ অক্টোবর দুটি তেল ট্যাংকার মাইনে আঘাত হেনে আগুন ধরে যায় — আর এই দাবির পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থা (আইএমও) সতর্ক করেছে, কৌশলগত এই জলপথে চলাচলকারী জাহাজের জন্য নৌ-মাইন গুরুতর হুমকি হয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে তেহরান নিজের আঞ্চলিক জলসীমার ভেতরে অননুমোদিত একটি নিজস্ব চলাচল করিডর চালু রেখেছে, যা ওয়াশিংটন ও আইএমও আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আইএমও মহাসচিব আর্সেনিও ডমিঙ্গেজ বলেছেন, উপলব্ধ ট্রাফিক পৃথকীকরণ পরিকল্পনা অনুযায়ী ওই রুটে এখনো মাইন রয়েছে; সংঘাত চলমান থাকায় তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে রুটটি নিরাপদ কি না যাচাই করাও কঠিন। তাঁর ভাষায়, কোনো জাহাজ ওই পথে যেতে চাইলে মাইনে আঘাত হানবে না — এমন নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌবাহিনী শনিবার বলেছে, হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার সময় নৌ-মাইনে আঘাত হেনে দুটি তেল ট্যাংকারে আগুন ধরে যায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার বরাত দিয়ে এই খবর জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দুটি ট্যাংকারই প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহন করছিল। ইরনার খবরে আরও বলা হয়, জাহাজ দুটি নিজেদের অবস্থান ও রাডার ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছিল এবং ইরানের অনুমোদন নেই এমন একটি রুট ব্যবহারের চেষ্টা করছিল; দ্বিতীয় ট্যাংকারটি মাইনে আঘাতের পর আটকে পড়ে।
ডমিঙ্গেজ ব্যাখ্যা করেন, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ঐতিহাসিকভাবে ১৯৬৮ সালে গৃহীত আইএমও-অনুমোদিত ট্রাফিক পৃথকীকরণ পরিকল্পনার ওপর নির্ভরশীল। তাঁর ভাষায়, আইএমও অনুমোদিত ও স্বীকৃত রুট একটাই এবং সব নৌ-চার্টে সেটাই রয়েছে; কিন্তু সেই রুট এখন মাইনমুক্ত নয় বলে নিরাপদও নয়।
তেহরানের নিজস্ব অস্থায়ী রুট প্রসঙ্গে ডমিঙ্গেজ বলেন, ইরানের কাছ থেকে ওই রুট প্রতিষ্ঠার খবর তাঁরা পেয়েছেন, তবে সংস্থার কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ বা সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তা হয়নি। অনুমোদনের জন্য যেকোনো অন্য রুট আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সদস্য রাষ্ট্রদের পর্যালোচনায় যেতে হয়; এমন কোনো প্রস্তাব তাঁরা পাননি। সংঘাতের কারণ দেখিয়েই ইরান রুটটি ব্যবহারের কথা জানিয়েছে বলে তিনি স্পষ্ট করেন।
তেহরানের করিডরে আইআরজিসি পরিচালিত টোল ও নিরাপত্তা ফি-এর কাঠামো চালু রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বলে ওয়াশিংটন ও আইএমও মনে করে। এই দ্বিমুখী দাবির মধ্যেই সংকীর্ণ এই চোকপয়েন্ট দিয়ে আন্তর্জাতিক চলাচল কার্যত ঝুঁকির মুখে।
ঘটনাপ্রবাহ এমন সময়ে ঘনীভূত হচ্ছে, যখন সংঘাত শেষ করা ও সমুদ্র চলাচল স্বাভাবিক করা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচনা থমকে আছে। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব ও সাবেক বিপ্লবী গার্ড কমান্ডার মহসেন রেজাই বলেছেন, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রতিক্রিয়া তেহরানের কাছে ‘পর্যাপ্ত নয়’। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাতটি শর্তের কয়েকটি মেনে নিয়েছে, তবে অন্য বিষয়গুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে; তেহরান আর জবাব দিচ্ছে না, বাকি বিষয়গুলো ওয়াশিংটনকেই স্পষ্ট করতে হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, মধ্যস্থতাকারী কাতারের মাধ্যমে তেহরান ওয়াশিংটনের কাছে একটি প্রস্তাব পেশ করেছে, যেখানে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া ও স্বাভাবিক সমুদ্র চলাচল ফেরানোর শর্তাবলি উল্লেখ রয়েছে। বাগদাদে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মন্তব্য পাঠিয়েছে যা তেহরান পর্যালোচনা করছে, তবে ইরানের প্রস্তাবই টেবিলে আছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সদিচ্ছা থাকলে প্রণালি খোলার পথ স্পষ্ট।
এদিকে গত দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালির আশপাশে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সময়ে বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত হানার কৌশলও বদলেছে তেহরান।
বাণিজ্যিক জাহাজ পরিচালনাকারীদের জন্য ডমিঙ্গেজের সতর্কবার্তা স্পষ্ট: মাইন ও হামলার চলমান হুমকির কারণে এই জলপথ এখনো স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরেনি। তাঁর ভাষায়, হরমুজ প্রণালি ‘সংঘাত শুরুর আগের মতো ব্যবসার জন্য খোলা নয়’। আইএমওর ভূমিকা এখন ফেরার সুযোগের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া — তবে মূল কারণগুলোর সমাধান না হলে তা সম্ভব নয়, আর সেই কারণগুলো আইএমওর এক্তিয়ারের বাইরে।
এই পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। ওয়াশিংটন-তেহরান আলোচনার পরবর্তী ধাপ আর প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতিই এখন ঠিক করবে, বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের এই প্রধান ধমনি কবে আবার নিরাপদে খুলবে।




