কানাডার পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক: ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলা করল নিউ জার্সির খাদ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান
কানাডার পণ্যের ওপর আরোপিত ৫০ শতাংশ শুল্কের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি খাদ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান। গেলার্ট গ্লোবাল গ্রুপ নামের নিউ জার্সিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি মঙ্গলবার নিউইয়র্কের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালতে এই মামলা দায়ের করে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এত ব্যাপক শুল্ক আরোপের আইনি ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নেই।
গেলার্ট গ্লোবাল গ্রুপ কানাডা থেকে পনির আমদানি করে। তিন প্রজন্মের পারিবারিক এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি বলছে, নতুন শুল্কের কারণে তাদের খরচ বেড়ে গেছে এবং সীমান্তের দুই পাশের সরবরাহকারীদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ব্যাহত হচ্ছে। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১১ অক্টোবরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে পাঁচ লাখ ২০ হাজার ডলারের বেশি শুল্ক দিতে হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টমাস গেলার্ট এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছেন, গেলার্ট গ্লোবাল গ্রুপ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে খাদ্য শিল্পের সরবরাহকারী, ক্রেতা ও অংশীদারদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। এই শুল্ক রাতারাতি সেই সম্পর্কগুলো ব্যাহত করছে এবং পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে খরচ ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
ট্রাম্প গত গ্রীষ্মে প্রথম এই ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, কানাডা আমেরিকায় তৈরি গাড়ি, মদ ও দুগ্ধজাত পণ্যের বিরুদ্ধে বৈষম্য করছে। সেপ্টেম্বরে তিনি এই ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণ করেন এবং প্রায় ১০০ কোটি ডলার মূল্যের কানাডীয় পণ্যের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন, যার মধ্যে মদ, দুগ্ধজাত পণ্য ও মোটরসাইকেল রয়েছে। মোট শুল্কের আওতায় পড়া কানাডীয় পণ্যের মূল্য প্রায় দুই হাজার কোটি ডলার।
মামলার কেন্দ্রে রয়েছে ১৯৩০ সালের স্মুট-হলি শুল্ক আইনের ৩৩৮ ধারা। এই ধারা অনুযায়ী, যেসব দেশ আমেরিকান ব্যবসার বিরুদ্ধে বৈষম্য করে বলে প্রমাণিত হয়, সেসব দেশের আমদানির ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসাতে পারেন প্রেসিডেন্ট। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বিধানটি এর আগে কখনোই ব্যবহার করা হয়নি; ট্রাম্পই এ বছর প্রথম এটি প্রয়োগ করলেন।
মামলায় যুক্তি দেওয়া হয়েছে, প্রশাসন যেসব কানাডীয় নীতিকে বৈষম্যমূলক বলছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্যই নয়। দুটি নীতি এসেছে প্রেসিডেন্টের নিজের শুল্কের জবাবে কানাডার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে, আর তৃতীয়টি কানাডার দুগ্ধ নীতি, যা যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তি (ইউএসএমসিএ) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মামলায় প্রশ্ন তোলা হয়েছে, মদ ও গাড়ি নিয়ে বিরোধের কারণে কানাডীয় পনিরের ওপর কেন কর বসানো হবে।
গেলার্টের পক্ষে মামলাটি দায়ের করেছে অলাভজনক আইনি সংগঠন লিবার্টি জাস্টিস সেন্টার। সংগঠনটির চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী সারা আলব্রেখ্ট বলেছেন, কোনো প্রেসিডেন্টেরই এমন ক্ষমতা থাকা উচিত নয় যে তিনি তাক থেকে একটি সুপ্ত আইন তুলে এনে কংগ্রেসের বেঁধে দেওয়া সীমা ছাড়াই ব্যাপক শুল্ক বা আমদানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবেন।
সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মামলা পরিচালক জেফরি শোয়াব বলেছেন, ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার মতো পরবর্তীকালে পাস হওয়া আইনগুলোতে তদন্ত, জনমত গ্রহণসহ নানা সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, আর সেগুলোই ৩৩৮ ধারাকে ছাড়িয়ে যায়। তাঁর ভাষায়, প্রশাসন ১৯৩০ সালের এমন একটি আইনের দিকে হাত বাড়িয়ে এসব সুরক্ষা এড়িয়ে যেতে পারে না, যা দিয়ে কোনো প্রেসিডেন্ট আগে কখনো শুল্ক আরোপ করেননি।
মামলায় আরও বলা হয়েছে, পুরোনো আইনটি ব্যবহারের অনুমতি থাকলেও প্রশাসন তার শর্ত পূরণ করেনি। আইন অনুযায়ী তালিকায় নতুন পণ্য যোগ হলে শুল্ক আদায় শুরুর আগে ৩০ দিন অপেক্ষা করতে হয়; কিন্তু সেপ্টেম্বরে পনিরের ওপর শুল্ক আদায় শুরু হয় মাত্র সাত দিনের মাথায়।
গেলার্ট আদালতের কাছে শুল্কগুলোকে অবৈধ ঘোষণা, সেগুলোর আদায় বন্ধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত আমদানিকারকদের সুদসহ অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ চেয়েছে। হোয়াইট হাউস ও মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর মামলাটি নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
এটি ট্রাম্পের শুল্কের বিরুদ্ধে চতুর্থ বড় আইনি চ্যালেঞ্জ। গত ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর ২০২৫ সালে আরোপিত বেশিরভাগ শুল্ক বাতিল করে দেন, পরে একটি বাণিজ্য আদালত অস্থায়ী ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্কের বিরুদ্ধেও রায় দেয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কথিত জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগে আরোপিত শুল্ক নিয়ে আরেকটি মামলা এখনো বিচারাধীন।
গত বছর হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর থেকে ট্রাম্প মার্কিন অর্থনীতির চারপাশে সুরক্ষামূলক শুল্কের প্রাচীর গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আগের আইনি পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রশাসন এখন বিকল্প আইনি কর্তৃত্ব খুঁজছে, আর কানাডা মামলাটি সেই প্রচেষ্টারই সর্বশেষ পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করছে ৩৩৮ ধারার ভবিষ্যৎ এবং দুই প্রতিবেশী দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের গতিপথ।





