হাইতির অভিবাসীর বদলে দেওয়া স্প্রিংফিল্ডকে আবার বদলাচ্ছে ট্রাম্পের বহিষ্কার অভিযান
ওহাইওর দক্ষিণ-পশ্চিমের ছোট শহর স্প্রিংফিল্ড হঠাৎ আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে ২০২৪ সালে, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হাইতির অভিবাসীদের পোষা প্রাণী খেয়ে ফেলার ভিত্তিহীন দাবি পুনরাবৃত্তি করেন। ঘনিষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বিতার এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারেও শহরটি আধুনিক আমেরিকার প্রতীক হয়ে উঠেছে—তবে কে বর্ণনা করছেন, তার ওপর নির্ভর করে সেই প্রতীকের অর্থ একেবারেই বদলে যায়।
ট্রাম্পের কাছে স্প্রিংফিল্ড বছরের পর বছর অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের কারণে আমেরিকার সমস্যাগুলোর সারসংক্ষেপ। আর আজ তিনি বলছেন, তাঁর ব্যাপক বহিষ্কার অভিযানের ফলে শহরের মানুষ ‘তাদের শহর ফিরে পাচ্ছে’। অন্যদের কাছে শহরটি আধুনিক আমেরিকার পরিচিত এক চক্রেরই গল্প—ঐতিহ্যবাহী শিল্পের পতন, তারপর সস্তা বাসস্থান ও কম মজুরির শ্রমের টানে অভিবাসনের ঢল।
২০ বছর বয়সী পিয়ের দামাস বেল ২০২৪ সালে বাবা ও সৎমায়ের কাছে স্প্রিংফিল্ডে আসেন। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও গ্যাং সহিংসতায় বিপর্যস্ত জন্মভূমি হাইতি থেকে পালিয়ে এসেছিলেন তিনি। মেক্সিকোতে অপেক্ষমাণ অভিবাসীদের জন্য তখনকার বাইডেন যুগের, এখন বিলুপ্ত একটি কর্মসূচির আওতায় সরকারের অনুমতি নিয়েই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন।
পরিবারের এক বন্ধুর মতে, বেল এরপর ‘টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস’ (টিপিএস) নামে মানবিক সুরক্ষা পান, যা যাচাইকৃত ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস ও কাজের অধিকার দেয়। টিপিএস সাধারণত ১৮ মাস স্থায়ী হয়, তবে সংশ্লিষ্ট দেশে বিপদ থেকে গেলে তা প্রায়ই বছরের পর বছর নবায়ন করা হয়।
ওই বন্ধুর মতে, বেল আমেরিকায় জীবন গোছানোর স্বপ্ন দেখতেন। তিনি ছিলেন মেধাবী ছাত্র, প্রতিভাবান খেলোয়াড় এবং মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তা হওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া একটি হাইস্কুল কর্মসূচির ক্যাডেট।
কিন্তু জুনে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা প্রায় সাড়ে তিন লাখ হাইতিবাসীর টিপিএস বাতিল হয়। বেলকে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা (আইস) এর একটি মাঠ কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়, সেখানে তাঁর পায়ে গোড়ালি-মনিটর পরিয়ে দেওয়া হয়, যা বহিষ্কারের মুখে থাকা অভিবাসীদের অবস্থান অনুসরণে ব্যবহৃত হয়।
বেল ইনস্টাগ্রামে লিখেছিলেন, এই ট্যাগ পরতে হওয়ায় তিনি ‘লজ্জা ও অপমান’ বোধ করছেন। আর ৩১ আগস্ট তিনি স্প্রিংফিল্ডের কাছের একটি মহাসড়কের পাশে গাড়ি থামিয়ে চলন্ত যানবাহনের সামনে হেঁটে যান এবং নিহত হন। তাঁর পরিবার এই মৃত্যুর জন্য গোড়ালি-মনিটর পরার অনুভূতিকেই দায়ী করেছে।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) বেলের মামলাটি নিয়ে বিবিসির প্রশ্নের জবাব দেয়নি। আইস অতীতে ‘আইসকে এই মৃত্যুর জন্য দায়ী করার যেকোনো চেষ্টা’ প্রত্যাখ্যান করেছে। সংস্থাটির এক মুখপাত্র যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘অবৈধভাবে দেশে থেকে বহিষ্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করা একটি পছন্দ। আবার বিনামূল্যের ফ্লাইটে বাড়ি ফেরা এবং ২,৬০০ ডলার নেওয়াও একটি পছন্দ।’
মৃত্যুর আগের সপ্তাহগুলোতে বেল বহিষ্কারের মুখে থাকা হাইতিবাসীদের জন্য স্প্রিংফিল্ডের একটি সহায়তা কেন্দ্রে যেতেন। কেন্দ্রটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ভাইলস ডরসেনভিল বিবিসিকে বলেন, বেল আইসের কাছে ট্যাগ খুলে দেওয়ার আবেদন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ছিলেন। তিনি বলেন, ‘তিনি দুইবার আইসের কার্যালয়ে গেছেন…ট্যাগ খুলে দিতে অনুরোধ জানাতে। ট্যাগ পরানো পর্যন্ত এখানে থাকার জন্য তিনি সবকিছু ঠিকঠাকভাবে করেছেন।’
সব মিলিয়ে ১৩টি দেশের দশ লাখের বেশি অভিবাসীর টিপিএস বাতিল করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই পরিবর্তনের ফলে অনেকেই রাতারাতি বৈধ বাসিন্দা থেকে অননুমোদিত অভিবাসী হয়ে গেছেন।
২০২৪ সালে সীমান্ত সুরক্ষিত করা ও অনিবন্ধিত অভিবাসীদের ব্যাপক বহিষ্কার ছিল ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের মূল প্রতিশ্রুতি। জরিপে দেখা যায়, সীমান্ত নীতি রিপাবলিকানদের মধ্যে এখনো শক্ত সমর্থন পেলেও অভিবাসন বাস্তবায়ন অভিযানের ধরন নিয়ে এই বছরে সমর্থন কমেছে।
আসন্ন মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনে ওহাইও একটি সুইং রাজ্য, আর রিপাবলিকানদের হাতে থাকা দুটি সিনেট আসনের একটি এবার লড়াইয়ে যাচ্ছে। অনুমোদন রেটিংয়ের পতন ঠেকাতে ও ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে ট্রাম্প ইতোমধ্যে দুইবার রাজ্যটি সফর করেছেন। এই মাসের শুরুতে ইয়াংসটাউনের এক সমাবেশে তিনি আবার স্প্রিংফিল্ড প্রসঙ্গ তোলেন। হর্ষধ্বনির মধ্যে তিনি বলেন, ‘ওহাইওতে সুন্দর একটি ছোট শহর আছে, যেখানে তারা প্রায় ৩৫ হাজার হাইতিবাসীকে ফেলে গেছে। তা, তাদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তারা প্রায় চলেই যাবে, আর আমরা তাদের শহর তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছি।’
প্রশাসন প্রথম ২০২৫ সালের জুনে হাইতিবাসীদের টিপিএস তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেয়; এরপর আইনি লড়াই সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায় এবং গ্রীষ্মে আদালত প্রশাসনের পক্ষেই রায় দেন। রায়ের পর হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সাধারণ পরামর্শদাতা জেমস পার্সিভাল বলেন, ‘টিপিএসের টি মানে টেম্পোরারি—অস্থায়ী; অথচ এসব মনোনয়নের অনেকগুলোই কার্যত সাধারণ ক্ষমায় রূপ নিয়েছিল। এটি আইনের শাসন ও সাধারণ বিচারবুদ্ধির জয়।’
আগস্টে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ সামাজিক মাধ্যমে সাদা পোশাক পরা শিকলবদ্ধ হাইতিবাসীদের বহিষ্কার ফ্লাইটে তোলার একটি ভিডিও পোস্ট করে। প্রফুল্ল সুরের সংগীতের সঙ্গে ভিডিওটিতে টিপিএসের মেয়াদ শেষ হওয়া হাইতিবাসীদের বলা হয়, ‘অবিলম্বে চলে যান’। প্রশাসন বলছে, আমেরিকানদের নিরাপদ রাখতেই শহরটিতে আইন প্রয়োগকারী অভিযান চালানো হচ্ছে; তাদের যুক্তি, হাইতি ফেরার মতো যথেষ্ট নিরাপদ। অথচ দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ ‘লেভেল ৪: ভ্রমণ করবেন না’ বিপদ সতর্কতার আওতায় রয়েছে।
দশকের পর দশক ধরে চলা অর্থনৈতিক পতনের চিহ্ন স্প্রিংফিল্ডে এখনো দৃশ্যমান—বন্ধ কারখানা আর তক্তা দিয়ে বন্ধ করা বাড়িঘরে। গত শতাব্দীতে শিল্পায়ন-পরবর্তী ধসে আমেরিকার এই মধ্য-পশ্চিমাঞ্চল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়; একসময়ের সমৃদ্ধ কারখানাগুলো থেকে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকরা উপকূলের দিকে কিংবা উষ্ণ দক্ষিণাঞ্চলের দিকে চলে যান।
গত পাঁচ বছরে আনুমানিক প্রায় ২০ হাজার জনের একটি হাইতি জনগোষ্ঠী শহরটিতে এসেছে। অনেকেই পালিয়েছিলেন ২০১০ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর; অন্যরা এসেছেন ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট জোভেনেল মোয়িজ হত্যাকাণ্ডের পরের সহিংসতা ও অস্থিরতার সময়। ফলে শহরের জনসংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়। টিপিএসের আওতায় বৈধ মর্যাদা থাকায় অনেক হাইতিবাসী কারখানা ও বিতরণ গুদামে কম মজুরির কাজ নিয়েছিলেন।
মেরিন বাহিনীতে কাজ করা রিক জনসন আইসের বহিষ্কার অভিযানের জোরালো সমর্থক; তাঁর বারান্দা পতাকায় সাজানো। তিনি বলেন, ‘আমরা আমেরিকাকে ভালোবাসি, আমেরিকানদের ভালোবাসি—যেকোনো ধরনের আমেরিকানকেই; কিন্তু তোমাকে একরকম আমেরিকান হতেই হবে।’ জনসন এক দশক আগে এই পাড়ায় এসেছেন; তাঁর ভাষায় শিল্পের পতনে পাড়ার বেশিরভাগ ফাঁকা হয়ে গেছে, চারপাশের সব বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে, প্রতিবেশী বলতে কেবল হাইতিবাসীরাই আছেন, যারা ‘আসলে আমাকে বিরক্ত করে না’। তবে তাঁর উদ্বেগ সংখ্যা ও পরিবর্তনের গতি নিয়ে: ‘আসলে পরিমাণটাই বিষয়। এখানে এলে বৈধভাবে আসা উচিত। টিপিএস শেষ…এবার যাওয়ার সময় হয়েছে।’
২০২৩ সালে একটি মিনিভ্যানের সঙ্গে সংঘর্ষে স্কুলবাস উল্টে গিয়ে ১১ বছর বয়সী এইডেন ক্লার্ক নিহত হয়। হাইতি থেকে আসা ভ্যানচালক হারম্যান জোসেফের বৈধ মার্কিন ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না; তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। এইডেনের বাবা নাথান ক্লার্ক পরে স্প্রিংফিল্ড সিটি কমিশনের সভায় বক্তব্য দিয়ে রাজনীতিবিদদের নিন্দা করেন—তাঁর ছেলের মৃত্যুকে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব উসকে দেওয়ার ‘রাজনৈতিক হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহারের জন্য; তিনি বলেন, তাঁর ছেলে দুর্ঘটনায় মারা গেছে।
শহরের আরেক প্রান্তে ২০ বছর আগে হাইতি ছেড়ে আসা পাসচুর ক্যাস্টেলির মুদি দোকানের তাকগুলো প্রায় খালি—শুধু ধর্মীয় মোমবাতি আর এই ধর্মপ্রাণ সম্প্রদায়ের কাছে জনপ্রিয় ক্যাথলিক সাধুদের ফ্রেমবন্দী ছবির তাকগুলোতেই পণ্য আছে। তিনি বলেন, ‘নতুন মাল কিনতে পারছি না, কারণ দোকানে কেউ আসছেই না। আমাদের সম্প্রদায়ে চিকিৎসক আছেন, প্রকৌশলী আছেন…আমরা এখানে এসেছি ভালো জীবনের জন্য, হাইতিতে পরিবারকে সাহায্য করতে। আমাদের দেশ নিরাপত্তা দেয় না।’ ২০ মিনিট পর দোকানে প্রথম খদ্দের এলেন—নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি তিন বছর ধরে গুদামে কাজ করছিলেন; টিপিএস হারানো অন্যদের মতো তাঁরও কাজের অধিকার হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে। ক্যাস্টেলির সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি ডান পায়ের প্যান্ট তুলে বড় একটি গোড়ালি-মনিটর দেখান—আইস বলছে, এগুলো তাদের আটকের বিকল্প কর্মসূচির অংশ।






