ইউরোপের সংকটের দায় চাপানো হচ্ছে মুসলিমদের ওপর: পার্লামেন্টের প্রস্তাব ঘিরে বিতর্ক
ইউরোপজুড়ে চলমান নানা সংকটের দায় ক্রমেই মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো হচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠেছে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাম্প্রতিক একটি প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাব দেখিয়ে দিচ্ছে, ইউরোপের মূলধারার রাজনীতিতেই মুসলিমবিদ্বেষী এজেন্ডা জায়গা করে নিচ্ছে।
গত সপ্তাহে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ যখন তীব্র হচ্ছিল, তখনই ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নীরবে পাস করে ‘ইসলামপন্থী অনুপ্রবেশ ও মুসলিম ব্রাদারহুড নেটওয়ার্কের প্রভাব মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৌশলের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক প্রস্তাবটি।
প্রস্তাবটি উত্থাপন করে মধ্য-ডানপন্থী ইউরোপীয় পিপলস পার্টি (ইপিপি), যেটি পার্লামেন্টের সবচেয়ে বড় দল এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েনের দল। প্রস্তাবটি পাস হয় ৩৮১ ভোটে, বিপক্ষে পড়ে ১৬৭ ভোট, আর ভোটদানে বিরত থাকেন ১৫ জন।
ইপিপির পাশাপাশি আরও চারটি গ্রুপ প্রায় ঐক্যবদ্ধভাবে প্রস্তাবটির পক্ষে দাঁড়ায়—অতি-ডানপন্থী প্যাট্রিয়টস ফর ইউরোপ ও ইউরোপ অব সভরেইন নেশনস, উদারপন্থী রিনিউ ইউরোপ এবং ইউরোপীয় কনজারভেটিভস অ্যান্ড রিফর্মিস্টস। অন্যদিকে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট, বামপন্থী ও গ্রিনরা মূলত বিপক্ষে ভোট দিলেও প্রস্তাবটি আটকাতে পারেনি।
এর আগের সপ্তাহগুলোর ঘটনাও এই বিতর্কের পটভূমি তৈরি করেছে। ফ্রান্সে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিলে দেশটির অতি-ডানপন্থীরা দ্রুতই বর্ণবাদী ভাষায় মুসলিম তরুণদের দায়ী করতে শুরু করে। তার কয়েক সপ্তাহ আগে হাজারো অভিবাসী মরক্কো থেকে স্পেনের ছিটমহল সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করলে স্পেনের অতি-ডানপন্থীরা সেটিকে মরক্কানদের সংগঠিত ‘আক্রমণ’ বলে আখ্যা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এতে যোগ দিয়ে দাবি করেন, বিষয়টি নাকি ‘ইসলামের দখল নেওয়ার’ চেষ্টা।
প্রস্তাবটিতে ‘ইসলামপন্থী অনুপ্রবেশ’কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে ‘প্রভাব বিস্তারের রাজনৈতিক কৌশল, ক্রমাগত কাঠামোগত বিস্তার, প্রাতিষ্ঠানিক অনুপ্রবেশ ও মতাদর্শগত বৈধতা অর্জন’ হিসেবে। এতে দাবি করা হয়েছে, সংগঠন, ফাউন্ডেশন এবং সাংস্কৃতিক, শিক্ষা, ধর্মীয়, দাতব্য, বিশ্ববিদ্যালয়, যুব, বৈষম্যবিরোধী ও সামাজিক কর্মকাণ্ডভিত্তিক বিস্তৃত কাঠামোর মধ্য দিয়ে এই প্রভাব কাজ করে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, বৈচিত্র্য, সমতা, অন্তর্ভুক্তি ও বৈষম্যবিরোধী কাঠামোগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতার মাধ্যম হিসেবে অন্য পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো নেটওয়ার্ক সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার বৈধ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সমাজে ‘অনুপ্রবেশ’ করে—এমনটাই দাবি করা হয়েছে।
প্রস্তাবটিতে ব্রাসেলসভিত্তিক ইউরোপীয় নেটওয়ার্ক অ্যাগেইনস্ট রেসিজম (ইনার)-সহ কয়েকটি সংগঠনের নাম উল্লেখ করে তাদের এই ধরনের আচরণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের তহবিলে তাদের প্রবেশাধিকার বন্ধ ও তাদের সঙ্গে কাজ করা ইইউ-অর্থায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সীমিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবটি বাধ্যতামূলক নয়, ফলে ইইউ সদস্যরাষ্ট্রগুলো এটি বাস্তবায়ন করতে বাধ্য নয়। মুসলিম ব্রাদারহুড রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে সহিংসতা পরিত্যাগ করায়, সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান পুরো ইউরোপে বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনাও কম বলে মনে করা হচ্ছে।
তারপরও সমালোচকদের মতে, প্রস্তাবটি একটি মতাদর্শগত কাঠামোকে বৈধতা দিচ্ছে, যার মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য গুরুতর পরিণতি হতে পারে। রাষ্ট্র থেকে স্বাধীনভাবে পরিচালিত মুসলিম প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলোকে এটি সন্দেহের চোখে ফেলছে, আর জনজীবনে মুসলিম নাগরিক সমাজের অন্তর্ভুক্তিকে উপস্থাপন করছে অনুপ্রবেশ হিসেবে।
সমালোচনায় আরও বলা হচ্ছে, ‘মুসলিম ব্রাদারহুড নেটওয়ার্ক’-এর মতো অস্পষ্ট ধারণা প্রায় যেকোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে সম্পর্কের ভিত্তিতে দোষারোপের সুযোগ তৈরি করতে পারে। বাইরের শক্তিগুলো এটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, আর ইতিমধ্যে তা হয়েছেও—সংযুক্ত আরব আমিরাত ইউরোপসহ বিভিন্ন জায়গায় ব্যক্তি ও সংগঠনকে ব্রাদারহুডের সহযোগী হিসেবে কলঙ্কিত করতে ব্যাপক প্রচারণায় অর্থ ব্যয় করেছে বলে অভিযোগ আছে।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রস্তাবটি মুসলিমদের বর্ণবাদ থেকে রক্ষার উদ্যোগকেই অনুপ্রবেশের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে চিত্রিত করছে বলে সমালোচকেরা বলছেন। এর ফলে ইউরোপীয় সমাজে মুসলিমবিদ্বেষ মোকাবিলার উদ্যোগ ও বিতর্ক সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, সদস্যরাষ্ট্রগুলোতে রক্ষণশীল জোটগুলো এই কাঠামো ব্যবহার করে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, আর নাগরিক স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিগুলো তার জবাব কীভাবে দেয়।




