বগুড়ায় কোটি টাকার সড়কের কাজ দুই বছরেও শেষ হয়নি, উধাও ১২ ট্রাক ইট, ভোগান্তিতে আট গ্রামের মানুষ
প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হওয়া বগুড়ার কাহালু উপজেলার একটি গ্রামীণ সড়ক পাকাকরণের কাজ দুই বছরেও শেষ হয়নি। কাজ শুরুর কয়েক মাসের মধ্যেই প্রথম ঠিকাদার উধাও হয়ে যান, এরপর একাধিক হাত বদলেও কাজ এগোয়নি। এর মধ্যে সড়ক থেকে গায়েব হয়ে গেছে ১০ থেকে ১২ ট্রাক ইট। অসমাপ্ত সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করা আট গ্রামের মানুষ ও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাহালু উপজেলার মালঞ্চা ইউনিয়নের কল্যাপাড়া গ্রাম থেকে কল্যাপাড়া আনোয়ারুল উলুম ফাজিল মাদ্রাসা পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়কটি আগে ইটের সোলিং করা ছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে এলজিইডির অর্থায়নে ৯৫ লাখ ৮১ হাজার টাকা ব্যয়ে ৯০০ মিটার দীর্ঘ সড়কটি পাকাকরণের কাজ শুরু হয়।
প্রথম পর্যায়ে ঠিকাদার সড়কের সোলিংয়ের সব ইট তুলে ফেলেন। কিন্তু এর কিছুদিনের মধ্যেই কাজ বন্ধ করে তিনি উধাও হয়ে যান। সড়কের পাশে তুলে রাখা ইটও একপর্যায়ে সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে একাধিক ঠিকাদার কাজটি হাতে নিলেও নির্মাণকাজ আর শেষ হয়নি।
বর্ষা মৌসুমে কাদার কারণে সড়কটি চলাচলের একেবারেই অনুপযোগী ছিল। বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমেও সড়কটি উঁচু-নিচু থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। সংশ্লিষ্ট দপ্তর ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা অসমাপ্ত কাজ শেষ করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, প্রায় আট গ্রামের মানুষ এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করেন। এ ছাড়া কল্যাপাড়া মাদ্রাসা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এ পথে যাতায়াত করে। কাজ শুরুর কয়েক মাসের মধ্যেই ঠিকাদার কাজ শেষ না করে উধাও হয়ে যান। বর্ষাকালে রাস্তাটি দিয়ে চলাচল করা যায়নি, এখন পুরো রাস্তা উঁচু-নিচু হওয়ায় পায়ে হেঁটে চলা ছাড়া যানবাহন চলাচলও কঠিন। তিনি দ্রুত সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ করে ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান।
সড়কটি সম্পর্কে মালঞ্চা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নেছার উদ্দিন বলেন, ঠিকাদার অন্য একটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। তাঁকে এ বিষয়ে বললে তিনি কাজ করবেন বলে আশ্বাস দেন। তিনি উপজেলা প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলেছেন, মাসিক সভাতেও সড়কের কাজ শেষ করার বিষয়টি তুলেছেন। প্রকৌশলী জানিয়েছেন, বর্ষা শেষ হলে কাজ করা হবে। তবে সড়কের কাজের বরাদ্দ তাঁর হাতে নেই এবং কাজটি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমানে কাজের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদার ও বগুড়া সদরের রাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাজিবুল ইসলাম খান বলেন, সড়কটির মূল ঠিকাদার তিনি নন। প্রথম ঠিকাদার ছিলেন জয়পুরহাটের একজন, এরপর বগুড়ার দুলু নামে একজন কাজটি নেন। কয়েকজনের হাতবদলের পর শেষ করার দায়িত্ব নেন তিনি। গত জাতীয় নির্বাচনের পর কাজ শুরু করে সড়কের সাববেজ পর্যন্ত কাজ শেষ করেছেন, এখন ডব্লিউবিএম ও কার্পেটিংয়ের কাজ বাকি।
দেরির কারণ হিসেবে তিনি খোয়ার সংকট ও বিটুমিনের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য, ডব্লিউবিএম ও কার্পেটিংয়ের কাজ একসঙ্গে করতে চান তাঁরা, কারণ ডব্লিউবিএম করার পর সড়ক ফেলে রাখলে বেড আবার মেরামত করতে হবে, এতে অতিরিক্ত খরচ হবে।
ইট গায়েবের বিষয়ে রাজিবুল ইসলাম খান বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার আগে সড়কটি পরিদর্শন করে দেখেছেন, সেখান থেকে ইট অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন, প্রায় ১০ থেকে ১২ ট্রাক ইট সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরে উপজেলা পর্যায়ে বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হয়; সরিয়ে নেওয়া ইটের পরিবর্তে এক লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে ইটের মূল্য ছিল প্রায় তিন লাখ টাকা বলে দাবি করে তিনি বলেন, কোনো ঠিকাদার লোকসান করে কাজ করবেন না।
কাহালু উপজেলা প্রকৌশলী মুক্তার হোসেন খান বলেন, তিনি এই উপজেলায় যোগদানের আগেই কাজটি শুরু হয়েছিল, তখন উপজেলা প্রকৌশলী ছিলেন মোখলেছুর রহমান। তাঁর আসার আগে থেকেই অনেক সড়কের কাজ বকেয়া পড়ে আছে। এত দিন বৃষ্টির কারণে কার্পেটিং করা যায়নি, আবার কিছু ক্ষেত্রে কাজের দর কম হওয়ার অজুহাতে ঠিকাদারেরা কালক্ষেপণ করছেন।
উপজেলা প্রকৌশলী আরও বলেন, বারবার বলার পরও ঠিকাদারেরা কাজ শুরু করছেন না; বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। খুব শিগগির ঠিকাদারদের ডেকে কাজ শুরু করতে বলা হবে। এরপরও যারা কাজ শুরু করবেন না, তাদের সংশ্লিষ্ট কাজের চুক্তি বাতিলের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এবার সত্যিই কাজ শুরু হবে এবং দুই বছর ধরে ঝুলে থাকা সড়কটির পাকাকরণ শেষ হবে। তবে ঠিকাদারদের ডাকা ও চুক্তি বাতিলের হুঁশিয়ারি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন ভোগান্তিতে থাকা গ্রামবাসী।



