ইউরোপের শেষ পূর্ণাঙ্গ পেনিসিলিন কারখানা সংকটে: চীনের সস্তা অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
অস্ট্রিয়ার আল্পসের সবুজ পাদদেশে দাঁড়িয়ে থাকা ইউরোপের সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ পেনিসিলিন উৎপাদন কেন্দ্রটি এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে। কুন্ডলে অবস্থিত স্যান্ডোজের এই কারখানায় যে ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ও তার উপাদান তৈরি হয়, চীন ঠিক সেই একই পণ্য অনেক কম খরচে ইউরোপের বাজারের জন্য উৎপাদন করছে, আর সেই প্রতিযোগিতাই কারখানাটির অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
কম দাম ইউরোপের ব্যয়-সচেতন সরকারগুলোর সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির জন্য স্বস্তির হলেও কুন্ডল কেন্দ্রের জন্য তা সংকট। কারণ এটিই ইউরোপের একমাত্র কেন্দ্র, যেখানে মূল সক্রিয় উপাদানসহ পেনিসিলিন তৈরির প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করা হয়। এই কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলে ইউরোপের নিজস্ব উৎপাদন বলতে আর কিছুই থাকবে না।
প্রতিযোগী বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার অথবা উৎপাদন চীনে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সেই পটভূমিতে কুন্ডল কারখানাটি পশ্চিমা বিশ্বের আত্মনির্ভরশীলতা নিয়ে চলমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে — প্রশ্নটি এখন শুধু একটি কারখানার নয়, পুরো মহাদেশের ওষুধ নিরাপত্তার।
কারখানাটির দিকে তাকিয়ে থাকা নিজস্ব কার্যালয় থেকে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কুন্ডল সাইটের ব্যবস্থাপক স্টেফানি জেডনার বলেন, এই কারখানাটি বন্ধ হয়ে গেলে ইউরোপ পুরোপুরি চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। কারখানাটির চারপাশে টাইরোলিয়ান আল্পস আর প্রাঙ্গণে সারি সারি সংরক্ষণ ট্যাংক — এই দৃশ্যের আড়ালেই চলছে টিকে থাকার লড়াই।
এক শতাব্দী আগে লন্ডনে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কার করেন, যা আজও প্রাণঘাতী সংক্রমণের চিকিৎসায় প্রধান অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে ইউরোপে প্রতি বছর প্রায় দেড়শ কোটি ডোজ পেনিসিলিন ব্যবহৃত হয়, অথচ তার প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরির বিষয়টি মূলত চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নে আমদানি করা পেনিসিলিন ও এর ডেরিভেটিভের ক্ষেত্রে চীনের হিস্যা ২০১৯ সালের ৪৪ শতাংশ থেকে বেড়ে গত বছর ৮৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই পণ্য মূলত বাল্ক আকারে আসে — ওষুধের সক্রিয় উপাদান বা এপিআই হিসেবে। এই উত্থান বেইজিংয়ের ‘মেড ইন চায়না’ দশ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার লক্ষ্য বৈশ্বিক উৎপাদন মূল্য শৃঙ্খলে নিজেদের অবস্থান আরও উন্নত করা।
অন্যদিকে ইউরোপ থেকে একই ধরনের পণ্যের রপ্তানি এখন ২০০০-এর দশকের শুরুর সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় এক-পঞ্চমাংশেরও কম। এটি দেখিয়ে দেয়, কীভাবে চীন বস্ত্র ও পণ্য সংযোজন থেকে বেরিয়ে এসে ওষুধ থেকে যন্ত্রপাতি পর্যন্ত ঐতিহ্যগতভাবে ইউরোপীয় শিল্পগুলোর দিকে এগিয়ে গেছে। ২০২৫ সালে চীনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ইউরোতে পৌঁছেছে — যা ২০২০ সালের তুলনায় দ্বিগুণ।
মাত্র তিন বছর আগে ২০ কোটি ইউরো ব্যয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্প শেষ করার পর স্যান্ডোজ এখন ইউরোপীয় কমিশনের কাছে ‘অ্যান্টি-ডাম্পিং’ তদন্ত শুরুর অনুরোধ জানিয়েছে — অর্থাৎ অন্যায্যভাবে কম মূল্যে পণ্য বিক্রির বিরুদ্ধে তদন্ত। গত মার্চে দায়ের করা অভিযোগে কোম্পানিটি বলেছে, চীন সরকার ভর্তুকি দিয়ে সহায়তা করায় চীনা অ্যামোক্সিসিলিন এপিআই ইউরোপের বাজারে উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে বিক্রি হচ্ছে। তদন্তের ফলে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের মতো পদক্ষেপও আসতে পারে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ব্রিটিশ আইনপ্রণেতাদের কাছে জমা দেওয়া লিখিত সাক্ষ্যে স্যান্ডোজ জানিয়েছে, সরকার পেনিসিলিনের জন্য আরও বেশি অর্থ না দিলে ইউরোপে পেনিসিলিন সরবরাহের ক্ষেত্রে কুন্ডলের সক্ষমতা ‘বাণিজ্যিকভাবে টেকসই’ নয়। তাদের যুক্তি, পেনিসিলিন সরবরাহ শৃঙ্খলার ওপর বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ একটি ‘অন্তর্নিহিত কৌশলগত ঝুঁকি’ তৈরি করে — অনেকটা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণের মতোই।
ওই নথিতে স্যান্ডোজ আরও সহায়তা চেয়ে লিখেছে, “অ্যান্টিবায়োটিক সরবরাহ ব্যবস্থা অর্থনৈতিক জবরদস্তি বা হাইব্রিড যুদ্ধের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে কূটনৈতিক উত্তেজনার সময়ে।” স্যান্ডোজের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের প্রায় ৯০ শতাংশ সক্রিয় উপাদান এখন ইউরোপের বাইরে উৎপাদিত হয় — বড় অংশ চীন থেকে, অথবা ভারত থেকে, যেখানে আবার চীনা রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয়।
কোম্পানিটির মতে, কুন্ডল ঝুঁকির মুখে থাকার বড় কারণ ইউরোপীয় সরকারগুলোর সংগ্রহনীতি — সরবরাহের বৈচিত্র্য বজায় রাখার পরিবর্তে কেবল সর্বনিম্ন মূল্যের ভিত্তিতে ওষুধ কেনা হয়। তীব্র প্রতিযোগিতা আর এই সংগ্রহ প্রক্রিয়ার কারণে তারা পণ্যের দামও বাড়াতে পারছে না। অথচ চীন বহু বছর ধরে নিজেকে প্রয়োজনীয় ওষুধের নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং অত্যাধুনিক ওষুধ শিল্পেও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ইউরোপীয় কমিশন শিগগিরই অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্ত শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ, কর্মকর্তা ও চীনবিষয়ক গবেষকরা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, অনেক অভিযোগ জমে থাকায় ঠিক কবে তদন্ত শুরু হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নে অ্যান্টি-ডাম্পিং ও ভর্তুকিবিরোধী যে ২৩টি তদন্ত চলছে, তার ২০টিতেই চীন এককভাবে অথবা অন্য দেশের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। ইউরোপীয় কমিশন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফলে কুন্ডলের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে ব্রাসেলসের সিদ্ধান্তের ওপর।





