‘কীভাবে হবে তা নিয়ে মাথা ঘামাই না’: রাশিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে ইউক্রেনের ওপর চাপ বাড়ালেন ট্রাম্প
রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে চুক্তিতে রাজি হতে ইউক্রেনের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে তাঁর টানাপোড়েন যত গভীর হচ্ছে, ততই কিয়েভকে ‘চেপে ধরে’ চুক্তিতে বাধ্য করার হোয়াইট হাউসের চেষ্টা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ট্রাম্প আবারও জেলেনস্কিকেই দায়ী করেন শান্তি প্রচেষ্টা আটকে রাখার জন্য। রাশিয়ার হাতে যুদ্ধে পাঠানোর মতো ‘অফুরন্ত’ জনবল আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জেলেনস্কিকে এই যুদ্ধের মীমাংসা চাইতেই হবে, আর যদি তিনি না চান, তাহলে আমার মনে হয় সেটা খুব খারাপ একটা ব্যাপার হবে।’
কিছুক্ষণ পরেই ট্রাম্প স্মরণ করেন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় ফেরার অল্প পরেই জেলেনস্কির সঙ্গে তাঁর বিতর্কিত ওভাল অফিস বৈঠকের কথা। তাঁর দাবি, জেলেনস্কি তখন ‘আরও ভালো চুক্তি’ করতে পারতেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘তাঁকে চুক্তি করতে চাইতেই হবে, কারণ আমার মনে হয় না তাঁর জনগণ আর এটা মেনে নেবে।’
অন্যদিকে মঙ্গলবারই নরওয়ের অসলোতে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন জেলেনস্কি; আলোচনার বিষয় ছিল রাশিয়ার যুদ্ধের অবসান। বৈঠক শেষে সামাজিক মাধ্যমে জেলেনস্কি বিস্তারিত না জানিয়ে লেখেন, শান্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে তাঁর দেশের কাছে ‘কিছু স্পষ্ট ধারণা’ আছে।
জেলেনস্কি লেখেন, ‘এই প্রচেষ্টায় আমরা আমাদের ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ, এবং আমরা চাই আমেরিকানরা এই ধারণাগুলো রাশিয়ানদের কাছে পৌঁছে দিক। গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলোর একটি হলো নেতাদের সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের দিকে এগিয়ে যাওয়া — যেসব বিষয় কেবল নেতারাই মীমাংসা করতে পারেন, সেগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য।’ তিনি আরও জানান, উইটকফ বুধবার রাশিয়া যাবেন, যেখানে শান্তি আলোচনা চলবে বলে আশা করা হচ্ছে। জেলেনস্কির মন্তব্য: ‘দেখা যাক পুতিন কী বলেন।’
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করা উচিত কিনা — এমন প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, দুই নেতার মধ্যে ‘প্রচণ্ড’ বিদ্বেষ রয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘একই ঘরে তাঁদের থাকাটা কঠিন।’ এরপরই তাঁর সেই মন্তব্য: ‘কীভাবে হবে, তা নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না।’
এই চাপের পাশাপাশি গত সপ্তাহে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্পেসএক্স পরিচালিত স্যাটেলাইট ব্যবস্থা স্টারলিংকের সামরিক সংস্করণ ‘স্টারশিল্ড’ ব্যবহারে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। রুশ হামলা ঠেকাতে যোগাযোগ ও গোয়েন্দা তথ্যের জন্য ইউক্রেন এই প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।
ইউক্রেনের স্টারশিল্ড ব্যবহার সীমিত করার নির্দেশ কে দিয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ও ট্রাম্পের মিত্র ইলন মাস্ক আঙুল তুলেছেন হোয়াইট হাউসের দিকে; ১৪ অক্টোবর তিনি লেখেন, ‘স্টারশিল্ড ব্যবস্থা মার্কিন সরকারের মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন। গতি বা ব্যবহারের যেকোনো সীমা মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টই নির্ধারণ করেন।’
রয়টার্সও দুজন মার্কিন কর্মকর্তা ও একজন পশ্চিমা কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, নির্দেশটি হোয়াইট হাউসের ভেতর থেকেই এসেছিল। তবে মঙ্গলবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ধীরগতির জন্য মাস্ক নিজেই দায়ী — তিনি গত সপ্তাহে এই নির্দেশ দিয়েছিলেন। ট্রাম্প ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দুজনেই সরকার এই সীমাবদ্ধতার নির্দেশ দিয়েছে বলে অস্বীকার করেছেন; হেগসেথ দায় ঠেলেছেন স্পেসএক্সের দিকে।
একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক সহজ করার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প। ২০২৫ সালের আগস্টে তিনি পুতিনকে আলাস্কায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন — এক দশকের মধ্যে রুশ নেতার প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর। সম্প্রতি তিনি এই মাসে পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় বসার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন।
ট্রাম্প এই মাসে আরও ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার চুক্তি করেছেন — যা মস্কোর অর্থনীতির ওপর বছরের পর বছর ধরে চলা মার্কিন চাপের এক নাটকীয় উল্টো মোড়। পাশাপাশি প্রয়াত সিনেটরের নামে প্রণীত দ্বিদলীয় ‘লিন্ডসে গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট’ অনুযায়ী আরোপ হওয়ার কথা থাকা নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও তিনি মওকুফ করেছেন, যদিও মাত্র এক মাস আগেই তিনি নিজে আইনটিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। ওই আইনে রুশ কর্মকর্তা, ব্যাংক ও ট্যাংকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং রাশিয়ার তেল কেনা দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের কথা ছিল।
মঙ্গলবার এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, আইনেই জাতীয় নিরাপত্তা মওকুফের বিধান ছিল এবং প্রেসিডেন্ট সেটিই ব্যবহার করেছেন, কারণ তিনি মনে করেন বিষয়গুলোকে সামগ্রিকভাবে দেখতে হয়। ভারতের নিউজ১৮-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রুবিও বলেন, নিষেধাজ্ঞা কতটা প্রয়োগ করা হবে আর তা বাকি বিশ্বের ওপর কী প্রভাব ফেলবে — এই দুইয়ের মধ্যে ট্রাম্প এক ধরনের ‘ভারসাম্য রক্ষা’ করছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আপনি যখন এই চাপ প্রয়োগ করেন, কখনো কখনো তা ছড়িয়ে পড়ে অন্য দেশগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’
সব মিলিয়ে ছবিটা দ্বিমুখী: একদিকে কিয়েভের ওপর চুক্তির জন্য প্রকাশ্য চাপ, অন্যদিকে মস্কোর প্রতি নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও কূটনৈতিক দরজা খোলা রাখা। বুধবার উইটকফের মস্কো সফর এবং সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় নেতৃবৃন্দের বৈঠকের প্রস্তাবই এখন বলে দেবে, ট্রাম্পের এই চাপের কৌশল শান্তির দিকে এগোয় নাকি যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন সম্পর্কে ফাটল আরও বাড়ায়।




