কেনিয়ায় প্রথম ইবোলা প্রাদুর্ভাব: নয়টি সংক্রমণ নিশ্চিত, সীমান্তজুড়ে সতর্কতা
কেনিয়া তার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইবোলা প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হয়েছে। দেশটিতে এখন পর্যন্ত নয়টি সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে, যার মধ্যে প্রথম রোগী দুই সপ্তাহ আগে মারা গেছেন। প্রতিবেশী উগান্ডা ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের (ডিআর কঙ্গো) মানুষ এই রোগের সঙ্গে লড়াইয়ে অভ্যস্ত হলেও কেনিয়ার জন্য এটি একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা।
প্রথম রোগী ডিআর কঙ্গো থেকে ভ্রমণ করে কেনিয়ায় এসেছিলেন এবং সেখানেই মারা যান। এরপর তাঁর চারজন আত্মীয়, তিনজন স্বাস্থ্যকর্মী এবং একজন হাসপাতাল পরিচ্ছন্নতাকর্মীর শরীরে ভাইরাস ধরা পড়েছে—অর্থাৎ এখন পর্যন্ত শনাক্ত সবাই প্রথম রোগীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
সরকার জনগণকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও ভাইরাসটি আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের কেনিয়া ভ্রমণ পুনর্বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছে; প্রতিবেশী উগান্ডা, ইথিওপিয়া ও সোমালিয়াও সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
ডিআর কঙ্গোতে মে মাসে ইবোলা নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে সেখানে চার হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন এবং সংক্রমণ ছাড়িয়েছে ৯ হাজার ৫০০—এটি এই রোগের ইতিহাসে দ্বিতীয় সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাব। আন্তর্জাতিক রেসকিউ কমিটির মতে, এই পরিস্থিতিতে সীমান্ত পেরিয়ে কেনিয়ায় নতুন সংক্রমণ আসার ঝুঁকি স্থিরভাবেই রয়ে গেছে।
এবারের প্রাদুর্ভাবের কারণ বুন্দিবুগিও প্রজাতির ইবোলা ভাইরাস, যা তুলনামূলকভাবে বিরল। এই প্রজাতির বিরুদ্ধে অনুমোদিত কোনো টিকা বা চিকিৎসা নেই, যদিও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
প্রথম রোগী কীভাবে ইবোলা-আক্রান্ত অঞ্চলে সময় কাটিয়ে, আরও দুটি দেশ ভ্রমণ করে অসুস্থতা শনাক্ত না হয়ে কেনিয়ায় পৌঁছালেন, তা নিয়ে শুরুর দিক থেকেই প্রশ্ন তুলেছেন কেনিয়ার মানুষ। কেনিয়ায় পৌঁছানোর কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি মারা যান। আঞ্চলিক পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে কেনিয়ার অবস্থানের কারণে প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বড় উদ্বেগের বিষয়।
কেনিয়ার চিকিৎসকদের সংগঠন সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে—উগান্ডা ও তানজানিয়ার সঙ্গে সীমান্তে এবং দেশের প্রধান বিমানবন্দরে—‘ফাঁকফোকর’ ও জনবল সংকটের অভিযোগ তুলেছে। সংগঠনটির প্রতিনিধি ডেনিস মিসকেলাহ বলেছেন, সীমান্ত ও বন্দর সুবিধাগুলোতে জনবলের তীব্র ঘাটতি রয়েছে।
তবে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্যাট্রিক আমোথ জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেন, অন্য আটজন রোগীই উন্নতির দিকে যাচ্ছেন এবং চিকিৎসায় ভালো সাড়া দিচ্ছেন। প্রথম সংক্রমণ ঘোষণার সময় কর্তৃপক্ষ আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিমানবন্দর ও সীমান্তে নজরদারি জোরদারের কথা বলেছিল।
কেনিয়া ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা দশটি দেশ—ডিআর কঙ্গো, উগান্ডা, তানজানিয়া, রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি, অ্যাঙ্গোলা, জাম্বিয়া, ইথিওপিয়া, দক্ষিণ সুদান ও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র—থেকে আসা যাত্রীদের জন্য বর্ধিত স্ক্রিনিং চালু করেছে। এসব দেশ থেকে আসা যাত্রীদের ফ্লাইটে ওঠার আগে ডিজিটাল নজরদারি ফরম পূরণ করে আসার পর বন্দর স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কাছে কিউআর কোড দেখাতে হয়।
দেশের ভেতরে সরকার সন্দেহজনক ঘটনা দ্রুত জানানো ও হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার উৎসাহ দিয়ে জনসচেতনতামূলক বার্তা ছড়াচ্ছে। হাত ধোয়া এবং অসুস্থ ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ এড়ানোর মতো স্বাস্থ্যবিধির ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। দেশজুড়ে চিকিৎসা ও আইসোলেশন সুবিধা নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং রোগটি মোকাবিলায় প্রায় পাঁচ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। কেনিয়াটা জাতীয় হাসপাতালের সংক্রামক রোগ ইউনিটে ইবোলা পরীক্ষার জন্য একটি নিবেদিত পরীক্ষাগারও স্থাপন করা হয়েছে।
প্রথম রোগীর সংস্পর্শে আসা ১৩৫ জনের মধ্যে ১৩৪ জনই কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন—অর্থাৎ প্রায় ৯৯ শতাংশ সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিকে শনাক্ত ও আলাদা করা গেছে। আন্তর্জাতিক রেসকিউ কমিটির মতে, এখন পর্যন্ত আক্রান্ত সবাই প্রথম রোগীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়াটা কেনিয়ার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কাজ করছে বলেই ইঙ্গিত দেয়। সন্দেহজনক উপসর্গ জানানোর জন্য টোল-ফ্রি জরুরি হটলাইন ৭১৯ চালু রয়েছে। সরকার আফ্রিকা সিডিসি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে।
তবু উদ্বেগ রয়েই গেছে। তিনজন স্বাস্থ্যকর্মী ও একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী আক্রান্ত হওয়ায় স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা সরঞ্জাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে; চিকিৎসক সংগঠনটি হাসপাতালগুলোতে পূর্ণ সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের দাবি জানিয়েছে। কেনিয়া এখনো খোলা রয়েছে—ভ্রমণ, বাণিজ্য বা জনসমাবেশে কোনো বিধিনিষেধ নেই, এবং জাতীয় লকডাউন বা সাধারণ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে নাকচ করেছে। প্রতিবেশী সোমালিয়ায় প্রথম রোগীর সংস্পর্শে আসা এক ব্যক্তি কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন এবং তার নমুনা পরীক্ষার জন্য কেনিয়ায় পাঠানো হয়েছে; তানজানিয়ায় যাত্রীদের জন্য ২১ দিনের দৈনিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ চালু হয়েছে।





