সাজেকে আবার পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা: বৃহস্পতিবার বিকেলের মধ্যে ছাড়তে হবে এলাকা, ফের অনির্দিষ্টকালের অবরোধ
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালিতে পর্যটকদের ভ্রমণে আবারও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে জেলা প্রশাসন। বুধবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেকের পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, আর সেখানে অবস্থানরত পর্যটকদের বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার মধ্যে এলাকা ছেড়ে নিরাপদে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার সন্ধ্যা ৭টা ৫১ মিনিটে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের মিডিয়া সেলে প্রকাশিত এক জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফীর স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে অনিবার্য কারণবশত এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশাসনের এই ঘোষণার আগে দিনের আরেকটি বড় সিদ্ধান্ত এসেছিল স্থানীয় দুটি সংগঠনের পক্ষ থেকে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে বৃহস্পতিবার থেকে সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। তিন দফা দাবি পূরণ না হওয়ার অভিযোগ তুলেই এই কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠন দুটি।
বুধবার বিকেল ৪টার দিকে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা ও সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা যৌথভাবে কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়, আর বুধবারের মধ্যে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের এলাকা ছেড়ে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
বিবৃতিতে সংগঠন দুটির নেতারা অভিযোগ করেন, জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যরা এখনো সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছেন। তাদের দাবি, সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নিয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এই দাবিতে এর আগেও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছেন তারা।
ঘটনার ধারাবাহিকতা বেশ লম্বা। এর আগে গত ১১ অক্টোবর সকাল থেকে সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু করেছিল সংগঠন দুটি। ওই দিন বিকেলে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দাবি পূরণের আশ্বাস দেওয়া হলে অবরোধ স্থগিত করা হয়।
তবে দাবি পূরণ না হওয়ার অভিযোগ তুলে ১৫ অক্টোবর পুনরায় অবরোধ পালন করে তারা। পরে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয় সংগঠন দুটি, আর সেই স্থগিতের মেয়াদ শেষ হতেই আবার এলো অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক।
মাঝের এই সময়টায় প্রশাসনের সিদ্ধান্তও বদলেছে একাধিকবার। ১৫ অক্টোবর জেলা প্রশাসন সাজেকে পর্যটক ভ্রমণে জারি করা আগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। প্রায় পাঁচ দিন বন্ধ থাকার পর পর্যটকদের জন্য আবার খুলে গিয়েছিল সাজেকের পর্যটনকেন্দ্রগুলো। কিন্তু নতুন অবরোধের ঘোষণার পর আবার বন্ধের সিদ্ধান্তে ফিরতে হলো প্রশাসনকে।
আগের অবরোধগুলোর সময় সাজেক-দীঘিনালা সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা বড় ভোগান্তিতে পড়েন। সড়কের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করায় পর্যটকবাহী গাড়িসহ নানা যানবাহন আটকে যায়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলোচনার পর গাড়িবহর চলাচলের অনুমতি মিলেছিল।
নতুন সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়েছে পূজার ছুটিতে সাজেকে যাওয়া হাজারো পর্যটকের ওপর। সাজেক রিসোর্ট মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা জানিয়েছেন, দুর্গাপূজার ছুটিতে বুধবার সকাল ও বিকেল মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পর্যটক সাজেকে প্রবেশ করেছেন। এখন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের কীভাবে নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা করবেন তারা। ঘন ঘন পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ হলে পর্যটন খাতে বড় ধরনের ক্ষতি হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
পর্যটকদের ফেরার ব্যবস্থা নিয়ে সাজেক রিসোর্ট মালিক সমিতির প্রচার সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টায় সেনাবাহিনীর এসকর্টে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হবে। সাধারণত দুটি এসকর্টের মাধ্যমে পর্যটকদের নেওয়া হলেও বৃহস্পতিবার সকালে একটি এসকর্টের মাধ্যমেই এই ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
নতুন নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের ঘোষণায় সাজেকের পর্যটন কার্যক্রম এবং সড়ক যোগাযোগ আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল। দাবি পূরণ নিয়ে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং অবরোধকারীদের সিদ্ধান্তের ওপরই এখন নির্ভর করছে, দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই পর্যটনকেন্দ্র কবে আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে।


