কোমোর কাছে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত ইউনাইটেড, প্রকাশ্যেই ঝগড়ায় জড়ালেন ক্যারিক ও ব্রুনো
ইউরোপের অন্যতম সফল ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড শেষ এক দশকে যেন এক অগ্নেয়গিরিতে রূপ নিয়েছে — আর সেই আগুনে এবার নতুন করে ঘি ঢেলেছেন দলের অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেজ ও কোচ মাইকেল ক্যারিক। বুধবার (২১ অক্টোবর) দিবাগত রাতে চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচে ইতালিয়ান ক্লাব কোমোর বিপক্ষে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছে তিনবারের চ্যাম্পিয়ন ও দুইবারের রানার্স-আপ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।
ইতালির জিউসেপ্পে সিনিগাগ্লিয়া স্টেডিয়ামে ম্যাচের দ্বিতীয় মিনিটেই পিছিয়ে পড়ে ইউনাইটেড। নিকো পাজের জোড়া গোলের সঙ্গে তাসোস দুভিকাস ও হাকোবো রামনের গোল কোমোকে এনে দেয় বড় জয়। যোগ করা সময়ে জশুয়া জির্কজির গোল কেবল হারের ব্যবধান কমিয়েছে।
হারটা বড়, কিন্তু ইউনাইটেডের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ম্যাচ শেষে কোচ ও অধিনায়কের বক্তব্য। দলের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলে ইউনাইটেডের পর্তুগিজ মিডফিল্ডার ব্রুনো বলেন, 'ম্যান-টু-ম্যান প্রেসিং না করার এবং কখনো কখনো পেছনে জায়গা ফাঁকা রাখার সিদ্ধান্তটি ছিল কোচিং স্টাফের।'
ব্রুনোর এই বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে খুব বেশি ঘুরিয়ে কথা বলেননি ক্যারিক। তাঁর জবাব ছিল স্পষ্ট — শুধু কৌশল দিয়েই ম্যাচ জেতা যায় না, মাঠে খেলোয়াড়দের পরিশ্রমও করা লাগে। দুই পক্ষের কথায় স্পষ্ট, ইউনাইটেডের সংকট এখন শুধু ফলাফলে সীমাবদ্ধ নেই।
ম্যাচের ৬৭ মিনিটে ব্রুনোকে তুলে নেন ক্যারিক। খেলা শেষে পর্তুগিজ মিডফিল্ডার অসন্তোষ প্রকাশ করেন দলের রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়ে। তাঁর মতে, কোমোকে বলের দখল ও আক্রমণ সাজানোর সুযোগ দিয়ে ফেলেছে ইউনাইটেড। প্রতিপক্ষকে শুরুতেই চাপে ফেলার বদলে অপেক্ষা করার কৌশল উল্টো তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে।
কোচিং স্টাফের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি ব্রুনো আরও আক্রমণাত্মক প্রেসিংয়ের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, প্রতিপক্ষকে বেশি সময় ও জায়গা দিলে তারা নিজেদের খেলাটা সহজেই খেলতে পারে।
ব্রুনোর বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে ক্যারিক দ্বিতীয়ার্ধে ম্যান-টু-ম্যান প্রেসিংয়ের কাছাকাছি কৌশল অনুসরণ করেও গোল হজম করার বিষয়টি সামনে আনেন। কোচ বলেন, 'দ্বিতীয়ার্ধে আমরা আসলে ম্যান-টু-ম্যান পদ্ধতিতে অর্ধেকটা প্রেস করেছিলাম। এরপর সেই পরিস্থিতি থেকেই একটি গোল হজম করেছি।'
ক্যারিকের বক্তব্যের সবচেয়ে কড়া অংশটি ছিল খেলোয়াড়দের পরিশ্রম নিয়ে। তিনি বলেন, 'আপনি যে পদ্ধতিতেই খেলুন, যে কৌশলই অনুসরণ করুন না কেন, যদি দৌড়াতে না পারেন, সামনে এগিয়ে দৌড়াতে না পারেন এবং পেছনে ফিরে দৌড়াতে না পারেন, তাহলে জিততে পারবেন না।'
দলের এমন পারফরম্যান্সে নিজের ক্ষোভও লুকাননি ইউনাইটেড কোচ। ক্যারিক বলেন, 'সত্যি বলতে, আমি ভীষণ রাগান্বিত। আমরা জিততে পারি, হারতেও পারি। কিন্তু আজ রাতে যেভাবে খেলেছি, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সমর্থকদের এটা জানাতে চেয়েছি যে তাদের কষ্টটা আমি বুঝতে পারছি।'
নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ক্যারিক জানান, এ মুহূর্তে নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবছেন না তিনি। বরং সমর্থকদের হতাশার প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ এবং দলের পারফরম্যান্সের দায় নেওয়াকেই গুরুত্ব দিয়েছেন।
গত মৌসুমে ক্যারিকের অধীনে প্রিমিয়ার লিগে তৃতীয় হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে ফেরার সুযোগ পেয়েছিল ইউনাইটেড। এরপর তাঁকে দুই বছরের চুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু নতুন মৌসুমে সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি দল।
ফলাফল খারাপ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে কোচের ওপর চাপও। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা সাত ম্যাচ জয়হীন থাকার হতাশা কাটেনি ইউনাইটেডের। দলের সংকট এখন মাঠের বাইরেও প্রকাশ্যে — কোচ ও অধিনায়কের এই প্রকাশ্য বাগ্যুদ্ধে সেটাই স্পষ্ট হয়েছে।
এই মৌসুমে ইউনাইটেডের ব্যর্থতা শুধু একটি ম্যাচের নয়। গত এক দশকে ক্লাবটিতে যে ফুটবলার বা কোচই এসেছেন, তাঁদের অনেকের ক্যারিয়ারই এই অস্থির পরিবেশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই পুরনো ছবিই আবার দেখা যাচ্ছে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে।
এখন প্রশ্ন — এই প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের পর কোচ ও অধিনায়ক মিলে দলকে ঘুরে দাঁড় করাতে পারবেন কি না। সামনের ম্যাচগুলোতেই তার জবাব মিলবে। তবে এতটুকু স্পষ্ট, ক্যারিক-ব্রুনোর এই বাগ্যুদ্ধ ইউনাইটেডের ভেতরের সংকটকেই সামনে এনেছে।


