রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন: আতঙ্কে নামতে গিয়ে আহত ৪০ রোগী, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে বিদ্যুৎহীন অন্ধকার
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিচ তলায় বিদ্যুতের কন্ট্রোল রুমে আগুন লাগায় ভয়াবহ ধোঁয়া আর আগুনের শিখা ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভবনে। প্রাণভয়ে হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় পদদলিত হয়ে ও পড়ে গিয়ে অন্তত ৪০ জন রোগী আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে আধা ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। তবে আগুন নেভার পরও হাসপাতালজুড়ে আতঙ্ক কাটেনি; রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে চরম উদ্বেগ।
আগুনের ঘটনায় পুরো হাসপাতাল অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় চেষ্টার পর কয়েকটি ওয়ার্ডে আংশিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করা গেলেও নেফ্রোলজি, হৃদরোগ, গাইনি ও কিডনি ডায়ালাইসিস ওয়ার্ড অন্ধকারেই থেকে যায়। ফলে জরুরি অপারেশনসহ সব ধরনের চিকিৎসা সেবা বন্ধ হয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সকাল সোয়া ৬টার দিকে নিচ তলার বিদ্যুৎ কন্ট্রোল রুমে আগুন লাগার পর মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে এবং ধোঁয়ায় ভরে যায় বিভিন্ন তলা। পাঁচতলা থেকে দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত বিভিন্ন ওয়ার্ডে থাকা রোগী ও তাঁদের স্বজনরা দ্রুত হাসপাতালের বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে পড়ে গিয়ে অন্তত ৪০ জন আহত হন।
বেলা বাড়ার পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। বিকেল ৪টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়, হৃদরোগ বিভাগ, প্যাথলজি ওয়ার্ড, চর্ম ও যৌন ওয়ার্ড, কিডনি ডায়ালাইসিস ওয়ার্ড ও নেফ্রোলজি ওয়ার্ডে বিদ্যুৎ ছিল না। বিদ্যুৎহীন ওয়ার্ডগুলোতে প্রচণ্ড গরমে রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
দ্বিতীয় তলার নেফ্রোলজি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগী সফিউল আলমকে কোলে করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামানোর সময় তাঁর দুই ভাতিজা পড়ে গিয়ে আহত হন; ওই সময় কিডনি রোগী সফিউল নিজেও আহত হন। ওই ওয়ার্ডের অন্তত ১৫ জন রোগী তাড়াহুড়া করে নিচে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়ে আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
গাইনি ওয়ার্ডের অবস্থা ছিল আরও হৃদয়বিদারক। সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুদের নিয়ে তিনতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে কয়েকজন শিশু আহত হয়েছে। গাইনি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগী মমতাজ বেগম জানান, পাঁচ দিন আগে তাঁর কন্যাশিশুর জন্ম হয়েছে; আগুন লাগার খবর শুনে শিশু সন্তানকে নিয়ে তাড়াহুড়া করে নিচে নামতে গিয়ে তিনি নিজেও আহত হন।
অনেকে লোহার তৈরি জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসেন। সেই পথেও ভিড়ের চাপে পদদলিত হয়ে বেশ কয়েকজন আহত হন। সব মিলিয়ে আহত রোগীর সংখ্যা অন্তত ৪০ জনে পৌঁছায়; তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. আব্দুল মোকাদ্দেম জানান, বিদ্যুতের শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান; রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন হাজারো রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। এমন একটি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস ও হৃদরোগের মতো সংবেদনশীল ওয়ার্ড ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকায় গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
আগুনের ঘটনায় হাসপাতালের বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কন্ট্রোল রুমে শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগা এবং তা ছড়িয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল — এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন রোগী ও স্বজনরা।
কর্তৃপক্ষ বলছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক করে চিকিৎসা সেবা আগের অবস্থায় ফেরানোই এখন প্রধান কাজ। আহত রোগীদের চিকিৎসা চলছে। তবে হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে অগ্নি ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা জোরদার না হলে এমন আতঙ্কের ঘটনা আবারও ঘটতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।




