কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রথম সমন্বিত ডিজিটাল কর্মকৌশল আনল বিশ্বব্যাংক
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বৃহৎ পরিসরে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রথমবারের মতো সমন্বিত ‘ডিজিটাল কর্মকৌশল’ উদ্বোধন করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। সংস্থাটির ওয়াশিংটন কার্যালয় থেকে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই বৈশ্বিক কৌশলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়।
নতুন এই নীতিমালায় বিশ্বজুড়ে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট নিশ্চিত করা, ডিজিটাল সেবার মানোন্নয়ন, তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের সার্বিক প্রস্তুতির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শুধু প্রযুক্তির প্রসার নয়, সেই প্রযুক্তি দিয়ে কীভাবে কাজের সুযোগ তৈরি হবে—সেটাই এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোতে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করবে। কিন্তু বিদ্যমান ধারা বজায় থাকলে এই সময়ের মধ্যে এসব দেশের অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে মাত্র ৪২ কোটি। এই বিশাল ব্যবধানই বিশ্বব্যাংককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
তরুণ জনগোষ্ঠীর এই বিশাল অংশের কাজের সুযোগ নিশ্চিত করতে এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাব্য সংকট নিরসনে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারকে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। ডিজিটাল অর্থনীতি ঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারলে নতুন ধরনের কাজ, নতুন সেবা ও নতুন উদ্যোগের পথ খুলবে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা উল্লেখ করেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ একদিকে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সক্ষম। তবে এই সুবিধার পূর্ণ রূপ পেতে হলে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট, কম খরচে প্রযুক্তিপণ্য, বাস্তবমুখী ডিজিটাল দক্ষতা ও কার্যকর সেবার সমন্বয় প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংকের এই রূপরেখায় চারটি বিষয়কে মূল অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে—নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগের বিস্তার, স্মার্টফোন ও ব্রডব্যান্ড ডেটার ব্যয় হ্রাস, ডিজিটাল সেবা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার পরিধি বাড়ানো এবং এআই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলা। এই চার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই কর্মসংস্থানমুখী ডিজিটাল রূপান্তরের পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।
নতুন এই কর্মকৌশল বাস্তবায়নে সদস্য দেশগুলোতে ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে কাজ করবে বিশ্বব্যাংক। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি পুঁজি না এলে বিশাল এই অবকাঠামো চাহিদা মেটানো কঠিন—সেই বাস্তবতাই এই পরিকল্পনায় প্রতিফলিত হয়েছে।
পাশাপাশি স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সেবার ব্যয় কমানো, জাতীয় ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা, ডিজিটাল লেনদেন এবং নিরাপদ তথ্য আদান-প্রদানের মতো মৌলিক পরিকাঠামো শক্তিশালী করতে সহায়তা দেওয়া হবে। এসব ভিত্তি শক্ত হলে ডিজিটাল সেবা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো সহজ হবে এবং নতুন কাজের ক্ষেত্রও তৈরি হবে।
সেই সঙ্গে সরাসরি চাকরির বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত ডিজিটাল প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। শুধু সাধারণ প্রশিক্ষণ নয়, বাজারে যে দক্ষতার চাহিদা আছে, সেই অনুযায়ী তরুণদের তৈরি করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
এ ছাড়া উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে আধুনিক এআই ব্যবহারের সুযোগ প্রসারে নতুন একটি বিশেষ উদ্যোগ চালুর ঘোষণাও দিয়েছে সংস্থাটি। এআই এখন বিশ্ব অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে; উন্নয়নশীল দেশগুলো যাতে এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়ে, সে প্রস্তুতির কথাই এই উদ্যোগে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের মতো তরুণ-নির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এই কৌশল বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করছে, অথচ প্রচলিত খাতে কাজের সুযোগ সেই হারে বাড়ছে না। সাশ্রয়ী ইন্টারনেট, ডিজিটাল দক্ষতা ও ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার ঘটলে ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স ও প্রযুক্তিভিত্তিক সেবায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে।
তবে কৌশল ঘোষণাই শেষ কথা নয়; বাস্তবায়নই হবে আসল পরীক্ষা। সদস্য দেশগুলোর সরকার, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন অংশীদারদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ১২০ কোটি তরুণের জন্য কাজ তৈরির এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলো মাঠপর্যায়ে কত দ্রুত দৃশ্যমান উদ্যোগে রূপ নেয়।




