ফারাজের ধনকুবের দাতার পুরনো ব্যবসায় ইরানের শাসক-ঘনিষ্ঠ ফাউন্ডেশনের নাম
ব্রিটেনের রিফর্ম ইউকে নেতা নাইজেল ফারাজের সবচেয়ে নতুন ধনকুবের দাতাকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, ব্যবসায়ী সাসান ঘান্দেহারি একসময় ইরানের ক্ষমতাধর একটি ধর্মীয় ফাউন্ডেশনের সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বে ছিলেন। ফাউন্ডেশনটি দেশটির সর্বোচ্চ নেতার কর্তৃত্বের অধীন—অথচ ফারাজ নিজে ইরানের কট্টর সমালোচক হিসেবেই পরিচিত।
হোসেইন ঘান্দেহারি, যিনি সাসান নামেও পরিচিত, এ গ্রীষ্মে রিফর্ম ইউকেকে লাখ লাখ পাউন্ড দেওয়ার অঙ্গীকার করার আগপর্যন্ত ব্রিটেনে তেমন পরিচিত ছিলেন না। তিনি ফারাজকে ৫০ হাজার পাউন্ড অনুদান দিয়েছেন, যাতে দাভোস ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের দুটি পাসের খরচ মেটে। দলকে নিয়মিত ‘এক-দুই মিলিয়নের চেয়ে বেশি’ অর্থ দিতে তিনি নিজের কর আবাস সুইজারল্যান্ড থেকে যুক্তরাজ্যে সরিয়ে আনছেন বলেও জানিয়েছেন।
৬১ বছর বয়সী ইরানি বংশোদ্ভূত এই ব্রিটিশ ব্যবসায়ী বলেন, তিনি এইচপি ট্রাস্ট নামে ১ হাজার কোটি ডলারের (প্রায় ৭০০ কোটি পাউন্ড) একটি তহবিল পরিচালনা করেন। তবে তার পরিবার কীভাবে এই সম্পদ গড়ল, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাতে তিনি রাজি হননি—শুধু বলেছেন, তহবিলটির সম্পদ রয়েছে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়।
এবার ফ্রান্সের একটি সালিসি রায়ের নথি এই ব্যবসায়ীর অতীতের ওপর নতুন আলো ফেলেছে। সেই নথি থেকে জানা যাচ্ছে, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ইরানের রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তার লেনদেন ছিল। ফাইবার-অপটিক ক্যাবল সরবরাহ ও নির্মাণের একটি প্রকল্পের যৌথ উদ্যোগে তার ভূমিকার বিবরণও সেখানেই পাওয়া গেছে।
নথি অনুযায়ী, ইরানজুড়ে টেলিযোগাযোগের ফাইবার-অপটিক ক্যাবল বসানোর ওই উদ্যোগের নাম ছিল ওমরান রাজাভি ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি। ঘান্দেহারির এইচপি ট্রাস্ট ছিল ওরি গ্রুপের চূড়ান্ত মালিক, আর ওরি গ্রুপ ২০১৫ সালে ওই উদ্যোগের ৪৯ শতাংশ অংশীদারিত্ব নেয়। বাকি ৫১ শতাংশের মালিক ছিল আস্তান কুদস রাজাভি (একিউআর)—মাশহাদভিত্তিক কয়েকশ কোটি পাউন্ডের ধর্মীয় ফাউন্ডেশন।
সে সময় একিউআরের প্রধান ছিলেন আয়াতুল্লাহ আব্বাস ভায়েজ তাবাসি। ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি তাকে ফাউন্ডেশনটির তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করেছিলেন; ১৯৭৯ সালের বিপ্লব থেকে ২০১৬ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি সেই পদে ছিলেন। তিনি পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিরও ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
যৌথ উদ্যোগটি ২০১৬ সালের দিকে শেষ হয়ে যায়। ভায়েজ তাবাসির স্থলাভিষিক্ত হয়ে একজন কট্টরপন্থী ওই ফাউন্ডেশনের দায়িত্ব নিলে ঘান্দেহারি-সমর্থিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্যোগটি থেকে ঠেলে বের করে দেওয়া হয়। একই সময়ে প্রকল্পটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রেজা নুরি ইরানের কুখ্যাত এভিন কারাগারে বন্দি হন; তিনি ১৮ বছরের সাজা ভোগ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ২০২১ সালে একিউআরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ওয়াশিংটনের মতে, ফাউন্ডেশনটি ইরানের অর্থনীতির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। আরেক রিফর্ম ইউকে দাতার সঙ্গেও ঘান্দেহারির ব্যবসায়িক যোগ পাওয়া গেছে—লন্ডনের উত্তরে পটার্স বারের জন রিচার্ড সিম্পসন। তার নকশা প্রতিষ্ঠান ইন্টেরিয়র আর্কিটেকচার ল্যান্ডস্কেপের মক্কেল ঘান্দেহারি পরিবার; সিম্পসন গত বছর রিফর্ম ইউকেকে ২ লাখ পাউন্ড দিয়েছেন।
ঘান্দেহারির আইনজীবীরা বলছেন, ইরানি করপোরেট নথি অনুযায়ী ওমরান রাজাভির ২০১৩ সালে ব্যাংক মেল্লাত ও ব্যাংক তেজারতে অংশীদারিত্ব ছিল—দুটি ব্যাংকই তখন পরমাণু কর্মসূচিতে জড়িত থাকার অভিযোগে নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল। তবে ওরি গ্রুপ ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে চুক্তি করার আগেই ওই ছোট অংশীদারিত্বগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল, এবং পুরো চুক্তিটি ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পেয়েছিল।
মামলা-সংশ্লিষ্ট আরেকটি তথ্যও সামনে এসেছে। হ্যাকার গোষ্ঠী এদালাত আলির ফাঁস করা বিচার বিভাগীয় কাগজপত্রে দেখা যাচ্ছে, চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর ঘান্দেহারি ও নুরি দুজনই ইরানে তদন্তের আওতায় ছিলেন। ঘান্দেহারির আইনজীবীরা এসব অভিযোগকে ‘ভুয়া’ আখ্যা দিয়ে বলছেন, লক্ষ্যবস্তুদের বদনাম করতে আর্থিক ও সামাজিক মামলা সাজানো ইরানি শাসকগোষ্ঠীর পরিচিত কৌশল। তারা আরও বলেছেন, ঘান্দেহারি ৩০ বছর ধরে ইরানে যাননি এবং তার সম্পদের সঙ্গে দেশটির কোনো সম্পর্ক নেই, কারণ ২০১৬ সালে তার পৈতৃক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল।
রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি ফারাজের জন্য অস্বস্তিকর। গত এক বছরে তিনি ইরানের তীব্র সমালোচনা করেছেন; মার্চে তিনি ইরানকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের চেয়েও যুক্তরাজ্যের জন্য বড় বিপদ বলে মন্তব্য করেছিলেন। জুলাইয়ে ফারাজ ও ঘান্দেহারির যৌথ সাক্ষাৎকারে একটি পত্রিকা ইরানে তার ব্যবসার কথা উল্লেখ করলেও শাসক-ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগের প্রসঙ্গটি সেখানে আসেনি; প্রকল্পটিকে ইরানে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।
ঘান্দেহারি পরিবারের সম্পদের উৎস এখনো স্পষ্ট নয়। ২০০৮ সালে তার প্রয়াত মা লন্ডনের ‘বিলিয়নিয়ার্স রো’ এলাকায় বাড়ি কেনার সময় পরিবারটির সম্পদ ধরা হয়েছিল প্রায় ২০০ কোটি ডলার; এখন তা নাকি ১ হাজার কোটি ডলার। সম্প্রতি একটি পিকাসো চিত্রকর্ম নিয়ে মামলায় ১৫ লাখ পাউন্ড আইনি খরচ বহনের সামর্থ্যের প্রমাণ চাওয়া হলে তার আইনজীবীরা শুধু দাভোস সফরের একটি প্রচারপত্র দেখিয়েছিলেন। হিসাবরক্ষণ প্রতিষ্ঠানের এক অংশীদারের চিঠিও পরে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ফলে রিফর্ম ইউকের নতুন দাতার সম্পদ ও অতীত লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন আপাতত রয়েই গেল।






