প্রধানমন্ত্রীর ছবিতে ‘স্নাইপার’ মন্তব্য: রাজশাহীর কলেজছাত্র ও তার কৃষক বাবা এখন ডিবি হেফাজতে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজশাহী সফরের ছবি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগে আটক কলেজছাত্র মো. আবু বক্কর সিদ্দিকের বাবা মো. আয়নাল হককেও আটক করা হয়েছে। পরে বাবা-ছেলে দুজনকেই গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকালে অভিযান চালিয়ে আবু বক্কর সিদ্দিককে আটক করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-৫। পরে তার বাবা আয়নাল হককেও আটক করা হয়। তারা দুজন এখন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার হেফাজতে আছেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে এসআরবি-৫-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়সাল ইশতিয়াক বলেন, আটকের পর তারা দুজনকেই ডিবির কাছে হস্তান্তর করেছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবে ডিবি, বলেও তিনি জানান।
আটক আবু বক্করের বাড়ি রাজশাহী নগরীর চন্দ্রিমা থানার কেচুয়াতৈল এলাকায়। তার বাবা আয়নাল হক পেশায় কৃষক। তার চার ছেলেমেয়ে, যাদের মধ্যে একমাত্র ছেলে আবু বক্কর সিদ্দিকই সবার বড়। আবু বক্কর রাজশাহীর নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পড়াশোনার পাশাপাশি ভ্যানে সবজি পরিবহনের কাজ করেন আবু বক্কর সিদ্দিক। তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন এবং এলাকায় ভালো ছেলে হিসেবে পরিচিত। তিনি বাইকারদের একটি দলের সঙ্গে যুক্ত এবং বাইক নিয়ে তাদের সঙ্গে দূর-দূরান্তে ঘুরে বেড়ান বলেও জানা গেছে।
আবু বক্করের মা আসমাউল হুসনা দাবি করেন, তার ছেলে নিরীহ, পরিশ্রমী ও মেধাবী। তাকে এই ঘটনার সঙ্গে ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। পরিবারের এই দাবি ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় আলোচনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পুলিশ, ডিবি ও এসআরবি সূত্রে জানা যায়, বুধবার বেলা ২টার দিকে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও চন্দ্রিমা থানা পুলিশের একটি দল তার বাড়িতে যায়। এ সময় আবু বক্করকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি এবং পরিবারের সদস্যরা তার অবস্থান জানাতে চাননি।
বিকাল ৪টার দিকে এসআরবি-৫-এর একটি দল সাদাপোশাকে তার বাড়িতে অভিযানে যায়। আবু বক্করকে না পেয়ে তারা তার বাবা আয়নাল হককে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একপর্যায়ে আয়নাল হক জানান, পবা উপজেলার হাটরামচন্দ্রপুর ঘোলহারিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে আত্মগোপন করে আছে তার ছেলে। পরে এসআরবি তার বাবাকে নিয়েই সেই বাড়িতে অভিযানে যায় এবং সেখান থেকেই আবু বক্করকে আটক করা হয়। ওই অভিযানে পরিবারের ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়।
বৃহস্পতিবার সকালে নগরীর চন্দ্রিমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম অভিযুক্ত যুবকের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছেন। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী তল্লাশি চালিয়েও জব্দ করার মতো কোনো আলামত পায়নি পুলিশ; শুধু একটি পেনড্রাইভের মোড়ক জব্দ করা হয়। পুলিশ আবু বক্করের ল্যাপটপ উদ্ধারের চেষ্টা করলেও পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, আবু বক্কর ল্যাপটপ ব্যবহার করতেন না, তার কোনো ল্যাপটপ নেই।
রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম জানান, আবু বক্কর সিদ্দিক কলেজের নিয়মিত ছাত্র। তিনি প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছেন, তবে এখনও ফলাফল হয়নি। কলেজে আবু বক্করের খারাপ কিছু তিনি দেখেননি বলেও জানান এই শিক্ষক।
এ ঘটনায় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এসেছে। রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি মাহমুদ হাসান লিমন বলেন, তিনি প্রশাসনের লোকজনের কাছে শুনেছেন আবু বক্কর আগে ছাত্রলীগ করত, এখন নাকি ছাত্রশিবির করছে; কিন্তু কলেজে তিনি নিজে কিছু দেখেননি এবং তাকে তারা সেভাবে চিনতেনও না। অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের রাজশাহী মহানগরের সভাপতি ইমরান নাজির বলেন, এখন কিছু হলেই শিবিরের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে, কিন্তু আবু বক্কর সিদ্দিক তাদের দলের কেউ নন। চন্দ্রিমা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম জানান, আবু বক্কর আগে কখনও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কি না, সে রকম কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি; তার নামে কোনো মামলাও নেই এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাও পাওয়া যায়নি।
ঘটনার সূত্রপাত গত মঙ্গলবারের প্রধানমন্ত্রীর রাজশাহী সফর থেকে। সেদিন রাজশাহী এসে বিমানবন্দর থেকে মাদ্রাসা ময়দান, সেখান থেকে ধর্মসভা হয়ে আবার বিমানবন্দরে যাতায়াতের সময় রুয়েটের বাস ব্যবহার করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পথে রাস্তার দুই ধারে অসংখ্য মানুষ তাকে শুভেচ্ছা জানায়, প্রধানমন্ত্রীও তাতে সাড়া দেন। পরে ‘দ্য বিউটি অব রাজশাহী’ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রধানমন্ত্রীর ওই বাসে বসে থাকার একটি ছবি পোস্ট করা হয়। সেই পোস্টের মন্তব্যের ঘরে আবু বক্কর সিদ্দিক লেখেন, ‘ইস! একটা বড় সুযোগ ছিল। শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল।’ সেই একটি মন্তব্যই এখন বাবা-ছেলের ডিবি হেফাজতে যাওয়ার কেন্দ্রে, আর পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কী হয়, সেদিকেই এখন সবার নজর।






