পাইকারি থেকে খুচরায় বড় ব্যবধান, ভোক্তার পকেট কাটার অভিযোগ
রাজধানীর পাইকারি বাজারে যে দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে, স্থানীয় বাজারে তা কিনতে ক্রেতাদের বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। চাল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন ও আদা থেকে শুরু করে মাছ, মুরগি এবং গরু-ছাগলের মাংস — প্রায় সব পণ্যের দামই পাইকারি বাজারের তুলনায় স্থানীয় খুচরা বাজারে তুলনামূলক অনেক বেশি।
কোনো কোনো পণ্যে কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা বা তারও বেশি ব্যবধান দেখা যাচ্ছে, আর মাছ-মাংসের বাজারে এই ব্যবধান আরও বেশি।
বুধবার (২১ অক্টোবর) রাজধানীর কাওরান বাজারের পাইকারি বাজার এবং মুগদা, মানিকনগর, খিলগাঁও, বাসাবো ও কমলাপুর এলাকার স্থানীয় বাজারের পণ্যমূল্য তুলনা করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
চাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে মাছ, মুরগি ও মাংসের দামের তুলনামূলক চিত্র বিশ্লেষণে পাইকারি ও খুচরা বাজারের ব্যবধান স্পষ্ট।
পাইকারি ও খুচরা — উভয় শ্রেণির ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে। এতে বিভিন্ন ধরনের পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।
তবে পাইকারি বাজারের তুলনায় স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে বিদ্যুৎ বিল, কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি ও দোকানভাড়া বাড়ার কথা জানিয়েছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা।
রাজধানীর মুগদা বাজারের ভাই-ভাই জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মোকলেছুদ্দিন মোল্লা জানান, তার দোকানে ৩ জন কর্মী রয়েছেন, বছরে বছরে তাদের বেতন বাড়াতে হচ্ছে। আগে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল আসত সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা, এখন সেটি ৬ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
দোকানভাড়াসহ বিভিন্ন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায় বাড়তি খরচ যুক্ত হয়েছে। পাইকারির সঙ্গে খুচরা বাজারে তারা যে ব্যবধানে মুনাফা নেন, সেটি আরও বাড়ানো উচিত বলে দাবি তার।
এই দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামে অস্বাভাবিক তারতম্যের পেছনে 'ওভারহেড খরচ'কে দায়ী করছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্ট অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক এবং স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন এ কে এম ওয়ারেসুল করিম।
তার মতে, দোকানভাড়া, দোকানে চাঁদাবাজি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের খরচ — এসব ওভারহেডের অংশ। ভোক্তা বাসায় হয়তো আবাসিক হারে বিদ্যুতের বিল দেন, কিন্তু দোকানগুলোকে বাণিজ্যিক হারে বিল দিতে হয়; এছাড়া কর্মচারী রাখার পেছনেও অনেক খরচ হয়। এসব ওভারহেড খরচ তুলে আনার একমাত্র জায়গা হচ্ছে পণ্যের দাম বাড়ানো।
তবে এ কে এম ওয়ারেসুল করিমের মতে, ব্যবধানটা কমানো উচিত — তবে জোর করে এটি কমানো যাবে না। এ জন্য দোকানের ওভারহেড খরচ কমাতে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে।
চালের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কাওরান বাজারে মোটা চাল গুটি স্বর্ণার ২৫ কেজির বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় — কেজি ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা। অথচ স্থানীয় বাজারে একই চাল ৫২ থেকে ৫৫ টাকা — কেজিতে ব্যবধান ৬ থেকে ৯ টাকা।
পাইজাম চালের ২৫ কেজির বস্তা ১ হাজার ২০০ টাকা (কেজি ৪৮ টাকা), স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৬ টাকায়। আটাশ চালের বস্তা ১ হাজার ৩৫০ টাকা (কেজি ৫৪ টাকা), স্থানীয় বাজারে দাম ৬০ থেকে ৬২ টাকা।
মিনিকেটের ক্ষেত্রেও একই চিত্র: কাওরান বাজারে রাজু মিনিকেটের ২৫ কেজির বস্তা ১ হাজার ৬৫০ টাকা (কেজি ৬৬ টাকা), স্থানীয় বাজারে ৭০ থেকে ৭৪ টাকা; দাওয়াত মিনিকেটের বস্তা ১ হাজার ৮৫০ টাকা (কেজি ৭৪ টাকা), স্থানীয় বাজারে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা।
আলু ও পেঁয়াজের দামেও বড় পার্থক্য: কাওরান বাজারে সাদা ও লাল আলুর কেজি ২০ টাকা, স্থানীয় বাজারে ৩০ টাকা — কেজিতে ১০ টাকা বেশি। বাছাইকৃত বড় পেঁয়াজের কেজি পাইকারিতে ৪২ থেকে ৪৪ টাকা, স্থানীয় বাজারে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা — ব্যবধান ১১ থেকে ১৮ টাকা।
আমদানিকৃত রসুন পাইকারিতে ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা, খুচরায় ২০০ থেকে ২১০ টাকা; আদা পাইকারিতে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা, খুচরায় ২০০ থেকে ২২০ টাকা।
মাছের বাজারে পার্থক্য আরও বড়: দুই কেজি আকারের রুই ও কাতলা পাইকারিতে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা কেজি, স্থানীয় বাজারে ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকা; পাঙাশ পাইকারিতে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, খুচরায় ২২০ থেকে ২৫০ টাকা (আকারভেদে ব্যবধান কেজিতে ৮০ টাকা পর্যন্ত)।
মুরগিতেও ব্যবধান স্পষ্ট: পোলট্রি মুরগি পাইকারিতে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি, খুচরায় ১৯০ থেকে ২০০ টাকা; সোনালি মুরগি পাইকারিতে ৩১০ থেকে ৩২০ টাকা, খুচরায় ৩৪০ থেকে ৩৫০ টাকা।
গরুর মাংস পাইকারিতে ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি, খুচরায় ৮২০ থেকে ৮৫০ টাকা; খাসির মাংস পাইকারিতে ১ হাজার ৩০০ টাকা, খুচরায় ১ হাজার ৪০০ টাকা; ছাগলের মাংস পাইকারিতে ১ হাজার ১৫০ টাকা, খুচরায় ১ হাজার ২০০ টাকা।
এই ব্যবধান কমাতে সরকারের সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর, ভোক্তা অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ দরকার বলে মনে করেন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান।
তিনি বলেন, 'অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের ক্ষেত্রে সরকার মূল্য নির্ধারণ করে দিতে পারে। সরকার বছরে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে — সাধারণত ভোজ্যতেল ও চিনির দাম মাঝেমধ্যে নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ব্যবসায়ীরা এমনভাবে ব্যবসা করছেন, যেখানে একটি গোপন সিন্ডিকেট রয়েছে বলে মনে হয়, যারা এসব নিয়ন্ত্রণ করে।'
তার ভাষায়, 'ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে যৌক্তিক বিক্রয়মূল্য ও ক্রয়-বিক্রয়ের রেকর্ড থাকার কথা। কিন্তু এগুলো করা হচ্ছে না। ফলে ভোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মুনাফা করে তাদের পকেট কাটা হচ্ছে, যা ভোক্তাদের স্বার্থবিরোধী।'






