করাচির শেষ দুই আফ্রিকান হাতির বাঁচার লড়াই: দুই বোন হারিয়ে এখন মধুবালাই ভরসা
পাকিস্তানের করাচিতে বন্দিদশায় থাকা শেষ দুটি আফ্রিকান হাতিকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই এখন নতুন করে আলোচনায়। চার বোনের মধ্যে দুজন ইতিমধ্যে মারা গেছে; বেঁচে থাকা মধুবালা ও মালিকার শারীরিক অবস্থা নিয়ে প্রাণীকল্যাণকর্মী ও চিকিৎসকদের উদ্বেগ কাটেনি। প্রশ্ন উঠেছে, শহরের চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্কের মতো প্রতিষ্ঠান আদৌ এত বড় বন্য প্রাণী লালনের সক্ষমতা রাখে কি না।
করাচি চিড়িয়াখানায় ১৭ বছর বয়সী আফ্রিকান হাতি নূর জাহানের মৃত্যু হয় ২০২৩ সালের ২২ এপ্রিল। তার শেষ দিনগুলোতে পাশে ছিলেন স্বেচ্ছাসেবী প্রাণীসেবক জুড অ্যালেন। অ্যালেনের স্মৃতিচারণায়, যন্ত্রণায় কাতর হাতিটির পা মালিশ করা, তার শয্যাক্ষতের সেবা করা আর গান শোনানোর মধ্য দিয়েই কেটেছিল সেই সময়টা। ৪৫ বছর বয়সী অ্যালেন বিভিন্ন করপোরেট চাকরি করলেও ছোটবেলা থেকেই প্রাণীদের সেবায় যুক্ত ছিলেন।
অ্যালেনের ভাষায়, নূর জাহানের সঙ্গে সেই ঘনিষ্ঠতাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বন্য আফ্রিকান হাতিটি যেদিন যন্ত্রণাকাতর মাথাটা তার কপালে ঠেকিয়ে তাকে প্রথম জড়িয়ে ধরেছিল, সেদিনই নাকি সবকিছুর অর্থ পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল তার কাছে। তিন বছর পর সেই শোকই তিনি পরিণত করেছেন নূর জাহানের বোন মধুবালার যত্নে, যার নিজের স্বাস্থ্যগত জটিলতাও কম নয়।
ঘটনার শুরু ২০০৯ সালে। তানজানিয়ায় ধরা পড়া চারটি হাতিশাবককে পাকিস্তানে আনা হয়, অভিযোগ রয়েছে—একজন প্রাণী ব্যবসায়ীর মাধ্যমে। তাদের মধ্যে নূর জাহান ও মধুবালাকে রাখা হয় করাচি চিড়িয়াখানায়, আর সোনিয়া ও মালিকাকে পাঠানো হয় একই শহরের বড় পরিসরের সাফারি পার্কে। তারপর থেকে চার বোনের দিন কেটেছে আলাদা আলাদা খাঁচাবন্দি পরিবেশে।
২০২০ সালে পাকিস্তানজুড়ে আলোচনায় আসে ইসলামাবাদের হাতি কাভানের গল্প। সঙ্গী সাহেলির মৃত্যুর পর আট বছর ধরে একা থাকা এশীয় হাতিটিকে ৩৫ বছর বন্দিদশায় কাটাতে হয়েছিল রাজধানীতে। আন্তর্জাতিক প্রাণীকল্যাণ সংস্থা ফোর পজের সহায়তায় কাভানকে কম্বোডিয়ার একটি অভয়ারণ্যে পাঠানো হয়, যেখানে সে এখন অন্য হাতিদের সঙ্গে থাকে। সেই ঘটনাই করাচির বোনদের দিকেও নজর টেনে আনে।
তত দিনে নূর জাহানের অবস্থা খারাপ হতে শুরু করেছে। ২০২১ সালে তার দাঁতে সংক্রমণ ধরা পড়ে; সঙ্গে ছিল অপুষ্টি ও মানসিক চাপের সমস্যা। অ্যালেন ও অন্য কর্মীরা তাকে বাঁচাতে পারেননি। তবে সেই ব্যর্থতা থেকে জন্ম নেয় বড় আন্দোলন—বন্দি প্রাণীদের যত্ন ও ন্যায়ের দাবিতে সরব হতে থাকেন পাকিস্তানি ও আন্তর্জাতিক কর্মীরা।
নূর জাহানের মৃত্যুর পর করাচি মহানগর করপোরেশন পরিচালিত চিড়িয়াখানায় একা হয়ে পড়ে মধুবালা। মাঝে মাঝে সে খাঁচার গেটে মাথা ঠুকত বলে জানান অ্যালেন; তার ভাষায়, মধুবালার একজন সঙ্গী দরকার ছিল, সে একজন বন্ধু চাইছিল। ফোর পজ হাতিগুলোকে পরীক্ষা করে ভালো খাবার, মানসিক উদ্দীপনা ও চিকিৎসার পরামর্শ দেয় এবং বোনদের আবার একসঙ্গে করার সুপারিশ করে।
অবশেষে ২০২৪ সালের নভেম্বরে সাফারি পার্কে ঘটে বোনদের পুনর্মিলন। ফোর পজের ধারণ করা দৃশ্যে দেখা যায়, সোনিয়াই প্রথম এগিয়ে আসে মধুবালার দিকে, তারপর আসে মালিকা; তিনজন শুঁড়ে শুঁড় ছোঁয়ায়, একসঙ্গে পানি পান করে। কিন্তু সেই আনন্দ টেকেনি। কয়েক দিন পর, ৮ ডিসেম্বর, খাঁচার ভেতর ঢলে পড়ে মারা যায় প্রায় ১৯ বছর বয়সী সোনিয়া।
পার্কের পরিচালক শুরুতে সোনিয়ার মৃত্যুর কারণ হিসেবে আপাত হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার কথা বললেও ফোর পজের পরবর্তী পর্যবেক্ষণে উঠে আসে পায়ের গভীর ক্ষতের সঙ্গে যুক্ত মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের তথ্য। সংস্থাটির বন্যপ্রাণী চিকিৎসক আমির খলিল তখন বলেছিলেন, এ ধরনের সংক্রমণ এক দিনে ছড়ায় না; তার মতে সোনিয়ার মৃত্যুর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের অনুপযুক্ত পরিবেশ ও অপুষ্টি।
মধুবালা ও মালিকা—দুজনের শরীরেই যক্ষ্মা শনাক্ত হয়েছিল। তবে মধুবালার চিকিৎসকের সাম্প্রতিক পরীক্ষায় তার শরীরে আর সেই সংক্রমণ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। ২২ বছর বয়সী মধুবালা ২০০ কেজির বেশি ওজন হারিয়ে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে শুয়ে পড়ার পর নিরাপদে ওঠাই কঠিন হয়ে গিয়েছিল তার জন্য। আমির খলিলের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন সে হাঁটার সক্ষমতার ৮৫ শতাংশ ফিরে পেয়েছে, আর উচ্চচাপের পানি দিয়ে পায়ে মালিশের মতো নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে চলা ‘ভালো রোগী’ হিসেবেই আচরণ করছে সে।
কর্মীদের সঙ্গে মধুবালার আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠার গল্পটাও কম নাটকীয় নয়। পরিবহন বাক্সে ওঠার প্রশিক্ষণে দেরি হওয়ায় সে বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিল; তখন ফুটবল খেলার মধ্য দিয়ে তার মন জয় করেন অ্যালেন। মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে মধুবালা বলটা শুঁড়ে তুলে নিজের পায়ের ফাঁকে লুকিয়ে রাখতে শুরু করে, সেবকদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে থাকে। সেই আস্থা অর্জনকেই অ্যালেন মনে করেন তার সবচেয়ে বড় সাফল্য।
করাচির মেয়র মুর্তজা ওয়াহাবের দাবি, মহানগর করপোরেশন গত ২০ বছরে কোনো প্রাণী সংগ্রহ করেনি; হাতিগুলো তার সময়ের অনেক আগেই আনা হয়েছিল। প্রাণীকল্যাণ সবার আগে—এ কথা বলে তিনি জানান, মধুবালার দেখভালে যে কেউ হাত বাড়ালে করপোরেশন কাজ করতে প্রস্তুত। অন্যদিকে সিন্ধু প্রদেশের শীর্ষ বন্যপ্রাণী কর্মকর্তা জাভেদ মাহেরের মতে, হাতি ও বন্যপ্রাণীর জায়গা তাদের নিজস্ব আবাসে; ফোর পজের হিসাবমতে সাফারি পার্কে হাতিদের ঘের প্রায় ১৪ হেক্টর, অথচ তিনি গ্রামাঞ্চলে শত শত একর জমি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যাতে হাতিগুলো মুক্তভাবে থাকতে পারে।
আইনি দিক থেকেও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামাবাদ হাইকোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি আতহার মিনাল্লাহ ২০২০ সালের এক যুগান্তকারী রায়ে প্রাণীদের অধিকার স্বীকার করেছিলেন; সেই রায়ের ভিত্তিতেই কাভানকে কম্বোডিয়ায় এবং দুটি হিমালয়ান ভালুককে জর্ডানের অভয়ারণ্যে পাঠানো সম্ভব হয়, ইসলামাবাদের চিড়িয়াখানা বন্ধ করে সেখানকার ৮৭৮টি প্রাণীকে মুক্তি বা স্থানান্তর করা হয়। মিনাল্লাহর মতে, সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল না হওয়ায় তা এখনো আইন হিসেবেই বলবৎ।
তবু বাস্তবতা হলো, হাতি দুটি এখনো সাফারি পার্কেই আছে। অ্যালেনের আক্ষেপ, অভয়ারণ্য হওয়ার কথা থাকলেও জায়গাটি কার্যত চিড়িয়াখানায় পরিণত হয়েছে—দর্শনার্থীরা হাতির একদম কাছে চলে যান, খাবার খাওয়ান। দীর্ঘমেয়াদে মধুবালা ও মালিকার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নির্ভর করছে কর্তৃপক্ষ সত্যিই তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে কি না—সেই প্রশ্নের ওপর।




