নারী শিল্পীদের নিয়ে আপত্তি: সুনামগঞ্জে বন্ধ হয়ে গেল বাউলগানের আসর
সুনামগঞ্জে নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণ নিয়ে আপত্তি ওঠায় বন্ধ হয়ে গেছে একটি বাউলগানের আসর। হাওর-বাঁওড়ের এই জেলায় বাউলগান শুধু বিনোদন নয়, শত বছরের লোকসংস্কৃতির প্রাণ — সেই আসর মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীদের মধ্যে হতাশা ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জানা গেছে, আসরটিতে নারী শিল্পীদের গান পরিবেশনের কথা ছিল। কিন্তু নারী শিল্পীদের নিয়ে আপত্তি ওঠার পর আসরটি আর চালিয়ে যাওয়া যায়নি। কারা এই আপত্তি তুলেছেন এবং আসরটি ঠিক কোন পর্যায়ে বন্ধ হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো জানা যায়নি।
বাউলগান বাংলার লোকসংস্কৃতির সবচেয়ে জীবন্ত ধারাগুলোর একটি। সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের গ্রামগুলোতে যুগ যুগ ধরে বাউল আসর বসে আসছে; শীতের রাতে, ফসল ওঠার পর কিংবা মেলা-পার্বণে এই আসরগুলো গ্রামের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়।
এই অঞ্চলের মাটি থেকেই উঠে এসেছেন বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের মতো কিংবদন্তি শিল্পী, যার গান আজ বিশ্বজুড়ে বাঙালির কাছে পরিচিত। রাধারমণ দত্ত ও হাসন রাজার মতো সাধক-শিল্পীদের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে এই বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের লোকঐতিহ্যের সঙ্গে।
বাউল আসরে নারী শিল্পীদের উপস্থিতি নতুন কিছু নয়। লোকসংগীতের মঞ্চে নারী কণ্ঠ দীর্ঘদিন ধরেই শ্রোতাদের মুগ্ধ করে আসছে, এবং অনেক নারী শিল্পী এই ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন নিজেদের প্রতিভায়।
তাই নারী শিল্পীদের নিয়ে আপত্তির মুখে একটি আসর বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে অনেকেই লোকসংস্কৃতির ধারাবাহিকতার জন্য উদ্বেগজনক মনে করছেন। তাদের প্রশ্ন, শিল্পীর পরিচয় নয়, শিল্প দিয়েই যেখানে বিচার হওয়ার কথা, সেখানে লিঙ্গের প্রশ্নে আসর বন্ধ হওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত।
অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে যেকোনো আয়োজনেই সামাজিক বাস্তবতা ও স্থানীয় মানুষের অনুভূতির বিষয়টি আয়োজকদের বিবেচনায় রাখতে হয়। আপত্তি ওঠার পর অনেক সময় আয়োজকেরা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আসর বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু সংস্কৃতিকর্মীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলে লোকসংস্কৃতির আয়োজনগুলো ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়বে। বিশেষ করে নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণের সুযোগ কমে গেলে লোকসংগীতের ধারাটিই দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
সুনামগঞ্জের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা হাওরকেন্দ্রিক হলেও এই জেলার পরিচিতির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তার সংস্কৃতি। দিরাই-শাল্লার বাউল ঐতিহ্য, হাওরের গান আর লোকমেলা এই অঞ্চলকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি।
বন্ধ হয়ে যাওয়া আসরটি আবার বসবে কি না, কিংবা আয়োজকেরা বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন কি না, তা এখনো জানা যায়নি। স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীদের প্রত্যাশা, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করে আসরটি আবারও বসবে এবং বাউলের সুরে মুখর হবে হাওরপাড়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু একটি আসরের নয় — প্রশ্নটি লোকসংস্কৃতির ভবিষ্যৎ আর নারী শিল্পীদের সম্মানজনক অংশগ্রহণের। সুনামগঞ্জের এই ঘটনা সেই পুরনো বিতর্কটিকেই আবার সামনে নিয়ে এল।


