মৌলভীবাজারে হামে ১৮ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ছাড়াল ২ হাজার ৩০০; দেশে একদিনে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু
সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে—জেলাটিতে হামে এখন পর্যন্ত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ২ হাজার ৩০০। একই সময়ে সারা দেশের চিত্রও উদ্বেগজনক: গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১৩৫ শিশু।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেশের সর্বশেষ এই চিত্র জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে এই সাত শিশুর মৃত্যু হয়। তবে এই ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হামে কারও মৃত্যু হয়নি; মৃত সাতজনই হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিল।
একই ২৪ ঘণ্টায় দেশে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে মোট ১ হাজার ১৩৫ শিশু। এর মধ্যে সন্দেহজনক হাম রোগী ১ হাজার ১১০ জন এবং পরীক্ষার মাধ্যমে হাম নিশ্চিত হয়েছে ২৫ জনের শরীরে। প্রতিদিন হাজারের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় প্রাদুর্ভাব এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলেই এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে মারা গেছে ১ হাজার ১১০ শিশু। এই সময়ে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে আরও ১০৪ শিশু। দুই অংশ মিলিয়ে প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে হাম ও হামের উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২১৪ জনে।
আক্রান্তের সামগ্রিক চিত্র আরও বড়। ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত দেশে মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার ৮৭০ জনে। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম রোগী ২৩ হাজার ২৭৩ জন। অর্থাৎ উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর একটি অংশের শরীরেই পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছে, বাকিদের ক্ষেত্রে উপসর্গের ভিত্তিতেই চিকিৎসা চলেছে।
হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যাও বিশাল। একই সময়ে সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৬৩৩ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯৮ জন। এই পরিসংখ্যান একদিকে দেশের হাসপাতালগুলোর ওপর চাপের চিত্র তুলে ধরে, অন্যদিকে দেখায় যে আক্রান্তদের বড় অংশই চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পেরেছে।
এই জাতীয় চিত্রের মধ্যেই মৌলভীবাজারের পরিস্থিতি আলাদা করে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। একটি জেলাতেই ১৮ জনের মৃত্যু ও ২ হাজার ৩০০-এর বেশি আক্রান্ত—সিলেট বিভাগের এই জেলাটি এখন প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। বিভাগজুড়ে হাম নিয়ে এমনিতেই উদ্বেগ চলছিল; মৌলভীবাজারের এই সংখ্যা সেই উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে।
পরিসংখ্যানের এই বিভাজন বোঝা জরুরি: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ‘সন্দেহজনক’ বা উপসর্গভিত্তিক রোগী এবং পরীক্ষায় ‘নিশ্চিত’ হাম রোগীকে আলাদাভাবে হিসাব করে। জ্বর ও ফুসকুড়িসহ হামের মতো উপসর্গ নিয়ে আসা প্রতিটি শিশুই প্রথমে সন্দেহজনক তালিকায় ওঠে; পরীক্ষার পর যাদের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়, তারা আলাদা হিসাবে যোগ হয়। এ কারণে মৃত্যু ও আক্রান্ত—দুই ক্ষেত্রেই দুটি করে সংখ্যা প্রকাশ করা হয়।
মৃতদের প্রায় সবাই শিশু—দৈনিক হালনাগাদে মৃত্যু ও আক্রান্তের হিসাব শিশুদের কেন্দ্র করেই দেওয়া হচ্ছে। সাত মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই প্রাদুর্ভাবে শিশুদেরই প্রাণ যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি, যা অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে তুলেছে।
১৫ মার্চ থেকে শুরু করে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত প্রাদুর্ভাবের এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতাও প্রশ্ন তুলছে। প্রতিদিনের হালনাগাদে কখনো কম, কখনো বেশি—কিন্তু মৃত্যু ও নতুন আক্রান্তের ধারা থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টার ১ হাজার ১৩৫ জন নতুন রোগী সেই ধারাবাহিকতারই সর্বশেষ উদাহরণ।
মৌলভীবাজারের মতো জেলাভিত্তিক বিস্তার ঠেকানো এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জেলাটিতে আক্রান্তের সংখ্যা যেভাবে ২ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে, তাতে স্থানীয় হাসপাতাল ও চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরের দৈনিক হালনাগাদেই বোঝা যাবে, প্রাদুর্ভাবের গতি কমছে নাকি আরও বাড়ছে। আপাতত মৌলভীবাজারের ১৮ মৃত্যু আর দেশজুড়ে একদিনে সাত শিশুর প্রাণহানি মিলিয়ে হামই এখন দেশের সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ—যার দিকে নজর রাখছেন সবাই।



