মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ইউরোপীয় কমিশনকে দ্রুত স্পষ্ট নির্দেশনার আহ্বান আইসিসির শীর্ষ কর্মকর্তার
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ইউরোপীয় কমিশনকে যত দ্রুত সম্ভব স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আদালতটির শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ওসভালদো জাভালা গিলের। তাঁর ভাষ্যে, ব্রাসেলসের স্পষ্ট অবস্থানের অভাবে কোম্পানি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো অন্ধকারে রয়েছে—তারা বুঝতে পারছে না ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত মানবে কি না, আর না মানলে কী ঝুঁকি নিতে হবে।
হেগভিত্তিক আদালতের দৈনন্দিন কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা রেজিস্ট্রার জাভালা গিলের পলিটিকোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, হোয়াইট হাউস ধাপে ধাপে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় তাঁর কাজই হয়ে দাঁড়িয়েছে নিষেধাজ্ঞার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
ট্রাম্প প্রশাসন প্রথমে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালতের প্রসিকিউটর ও বিচারকদের লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা দেয়, এরপর চলতি বছরের ৯ অক্টোবর পুরো আদালতের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বারবার ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে আদালতের পাশে দাঁড়ালেও মার্কিন আইন মানতে কোম্পানিগুলোকে নিষেধ করবে—এমন একটি ব্যবস্থা চালু করার আহ্বান এড়িয়ে গেছে।
এই দ্বিধাই হেগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের উদ্বেগে ফেলেছে। ৯ অক্টোবরের ঘোষণার পর ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আইনপ্রণেতাদের পক্ষ থেকেও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার চাপ বাড়ছে। মঙ্গলবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে কায়া কাল্লাস বলেন, ব্রাসেলস আগামী কয়েক মাস বিষয়টি নিয়ে সংলাপ শুরুর জন্য ব্যবহার করবে। নতুন নিষেধাজ্ঞা আগামী বছরের এপ্রিলে কার্যকর হওয়ার কথা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কায়া কাল্লাসের আদালত সদর দপ্তর সফরের আগের দিন নিজের কাচঘেরা কার্যালয় থেকে জাভালা গিলের বলেন, তিনি আশা করেন সংলাপের এই সময়টাকে আদালতকে রক্ষার অপেক্ষা হিসেবে দেখা হবে না।
ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কায় আদালত ছয় মাস ধরে মার্কিন প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের ছেড়ে ওপেন-সোর্স সফটওয়্যার পরিবেশে চলে গেছে, আর আর্থিক লেনদেন ডলারমুক্ত করতে সময় লেগেছে ২০ মাস। জাভালা গিলেরের দলের জন্য এটি ছিল বিশাল এক কাজ।
২০২৩ সালে বড় সাইবার হামলার শিকার হওয়ার পর আদালত প্রথমে মার্কিন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার মুখে সেই সমাধানই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান ব্যবস্থায় টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে ছাড় থাকলেও তা বহাল থাকার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাঁর ভাষায়, এটি মাথার ওপর ঝুলন্ত তলোয়ারের মতো, যেকোনো সময় প্রত্যাহার হতে পারে; তিনি আর মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না।
মার্কিন প্ল্যাটফর্মগুলো একক চুক্তিতে পুরো ব্যবস্থা দেয়। সেগুলো ছাড়া চলতে হলে নিজস্ব কাঠামো ও এমন সব ব্যবস্থা তৈরি করতে হয়, যেগুলো পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে পারে—বলেন রেজিস্ট্রার।
আর্থিক স্বায়ত্তশাসন অর্জনও সমান কঠিন ছিল। কোনো লেনদেনে যেন মার্কিন ব্যক্তি, ব্যাংক বা মুদ্রার সংযোগ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে আদালত সব সরবরাহকারীর লেনদেন খতিয়ে দেখেছে। সব কর্মীকে ইউরোপীয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়েছে, চুক্তিগুলো ইউরোতে করা হয়েছে—ব্যক্তি ও কোম্পানি ধরে ধরে করা এই বিস্তারিত প্রক্রিয়ার কথা জানান তিনি। ফলে আদালত এখন কয়েক ডজন ব্যাংকের বদলে মাত্র কয়েকটি ব্যাংক নিয়ে কাজ করছে, কারণ ডলারমুক্ত লেনদেনে স্বস্তি বোধ করে এমন প্রতিষ্ঠান হাতে গোনা।
ইউরোপীয় দেশ ও কমিশনের স্পষ্ট নির্দেশনা ছাড়া এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। জাভালা গিলেরের ভাষায়, আইসিসি যদি ইউরোপে, ইউরোতে, কোনো মার্কিন সংযোগ ছাড়া সেপা অঞ্চলে লেনদেনই করতে না পারে, তাহলে ইউরোপের আর্থিক সার্বভৌমত্ব নিয়েই বড় প্রশ্ন ওঠে।
আদালত দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ব্লকিং স্ট্যাটিউট নামে পরিচিত আইনি ঢাল ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে আসছে, যা ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মানতে নিষেধ করবে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের কয়েক ডজন আইনপ্রণেতা এই দাবির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, আর বৃহস্পতিবার পার্লামেন্ট আদালতটিকে মানবাধিকারবিষয়ক সাখারভ পুরস্কারও দিয়েছে।
জাভালা গিলেরের মতে, ব্লকিং স্ট্যাটিউট একতরফা বহিঃসীমান্ত নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়—এমন ন্যূনতম পরিসর পুনঃপ্রতিষ্ঠার হাতিয়ার; সেই ন্যূনতম পরিসর অন্তত ইউরোজোন হওয়া উচিত। এই আইন না হলেও অন্তত ইউরোজোনের ভেতরে আদালত কাজ চালিয়ে যেতে পারবে—এমন আশ্বাস দরকার বলে তিনি বলেন। অন্তর্বর্তী পদক্ষেপ হিসেবে কোম্পানিগুলোকে মার্কিন ব্যবস্থা মানতে হবে না মর্মে আশ্বস্ত করে কমফোর্ট লেটার দেওয়ার প্রস্তাবও দেন তিনি।
এখন পর্যন্ত কমিশন সতর্ক পথ বেছে নিয়েছে; একজন ইউরোপীয় কূটনীতিকের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপকে সময় কেনার উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত সপ্তাহের সম্মেলনে ইউরোপীয় নেতারা ব্রাসেলসের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সমর্থন দিলেও আদালতকে সমর্থনে যা যা দরকার, তা করার অঙ্গীকার করেছেন। জাভালা গিলের আশা করেন, ইউরোপীয় কাউন্সিল দরজা খুলে দেওয়ায় কমিশন এখন বাড়তি পদক্ষেপ নিতে স্বস্তি বোধ করবে এবং অন্তত স্পষ্ট নির্দেশনা দেবে।
রেজিস্ট্রার জোর দিয়ে বলেন, নিষেধাজ্ঞা শুধু ব্যাংক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়; বর্তমান অনিশ্চয়তা আদালতের সঙ্গে কাজ করা এনজিওগুলোকেও প্রভাবিত করেছে। উগান্ডায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ কিংবা ইউক্রেনে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তাসহ আদালতের কাজে এনজিওগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর ভাষায়, এটি বিশাল এক শীতল প্রভাব তৈরি করেছে—আইনি সুরক্ষা আছে কি না না জানায় তারা আদালতকে সমর্থন চালিয়ে যেতে পারবে কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে।
আদালতের ছয়টি টাওয়ারঘেরা ৪৬ হাজার বর্গমিটারের কমপ্লেক্সের একটি ভবনে আগামী মাসে ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিচার শুরু হওয়ার কথা। এই বিশাল প্রতিষ্ঠানটির দেখভালই জাভালা গিলেরের দায়িত্ব, আর এখন সেই দায়িত্বের বড় অংশজুড়ে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার প্রস্তুতি।




