প্রেসিডেন্টের পদ ছেড়ে প্রধানমন্ত্রীর লড়াইয়ে ভুচিচ, ছাত্রদের দলই ১৪ বছরের শাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
সার্বিয়ার দীর্ঘদিনের নেতা আলেক্সান্দার ভুচিচের সামনে তার ১৪ বছরের শাসনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করে তিনি এখন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য নির্বাচনে লড়ছেন, আর তার প্রতিপক্ষ হিসেবে উঠে এসেছে ছাত্র বিক্ষোভকারীদের প্রতিষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক শক্তি।
হেনরি জ্যাকসন সোসাইটির সহযোগী ফেলো হেলেনা ইভানভ বলেছেন, এটি নিশ্চিতভাবেই সাবেক প্রেসিডেন্টের ১৪ বছরের শাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তার মতে, ছাত্র বিক্ষোভকারীরা মানুষের হৃদয় ও মন জয় করতে পেরেছে এবং গতিটা এমনভাবে ধরে রেখেছে, যা প্রতিষ্ঠিত বিরোধী দল কোনো দিনই পারেনি।
অন্যদিকে সার্বিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো দজুরিচ বলেছেন, ছাত্র বিরোধীরা জিতবে বলে তিনি মনে করেন না, সম্ভাবনা খুবই কম। তার ভাষ্য, সার্বিয়ার মানুষ তাদের চিনে ফেলেছে—বছরের পর বছর সমালোচনা করেও তারা জনগণকে বিশ্বাস করাতে পারেনি যে তাদের বিশ্বাসযোগ্য কর্মসূচি বা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর কোনো পরিকল্পনা আছে।
দজুরিচ ভুচিচের অধীনে সার্বিয়ার অর্থনীতির প্রশংসা করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সংলাপের কথাও তুলে ধরেছেন। তার মতে, এই সংলাপ আরও সহযোগিতা বাড়াবে এবং সার্বদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
জুনে প্রেসিডেন্ট থাকাকালেই দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভুচিচ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে রূপান্তরের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় জিডিপি ছিল তিন হাজার ২০০ কোটি ইউরো, আর এ বছর তা ১০ হাজার কোটি ইউরোর বেশি—প্রায় ১২ হাজার কোটি ডলার—হতে যাচ্ছে। ভুচিচ প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন ২০১৪ সালে এবং প্রেসিডেন্ট হন ২০১৭ সালে।
একই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ওয়াশিংটন ও বেলগ্রেডের উন্নত সম্পর্ক ক্রমেই অর্থনীতি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও অভিন্ন রক্ষণশীল মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে। সার্বিয়া একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে চলছে, ইসরায়েলের পাশে দাঁড়াচ্ছে এবং কসোভোকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান প্রতিহত করছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে উদ্বেগও বাড়ছে। সিনেটর চাক গ্রাসলি ও রিচার্ড ব্লুমেন্থালের নেতৃত্বে একটি দ্বিদলীয় দল সার্বিয়ায় গণতান্ত্রিক পশ্চাৎপসরণ মোকাবিলা, আইনের শাসন ও জবাবদিহি বাড়ানো এবং ছাত্র-নেতৃত্বাধীন নাগরিক বিক্ষোভের প্রতি আচরণ উন্নত করতে একটি আইন প্রস্তাব এনেছে, যার নাম সংক্ষেপে স্রবিয়া। এতে ভবিষ্যৎ সহায়তা শর্তযুক্ত করার প্রস্তাব আছে—প্রেসিডেন্টের প্রত্যয়ন লাগবে যে সার্বিয়া বিচারিক জবাবদিহি, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ইইউ ও ন্যাটোর সঙ্গে সামঞ্জস্যের দিকে উল্লেখযোগ্য ও টেকসই অগ্রগতি করেছে।
পর্যবেক্ষকদের মধ্যে আশঙ্কা আছে, নির্বাচনটি শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতে পারে এবং ফলাফল খর্ব করার চেষ্টা এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। অন্যরা আশঙ্কা করছেন, স্টুডেন্ট লিস্ট জিতলেও বর্তমান সরকার সেই ফলাফল মানবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে।
ভুচিচ ২০১৭ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তার আগে ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী তিনি মেয়াদ-সীমায় আটকে গিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়ায় তার জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফিরে ক্ষমতায় থাকার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বরে তিনি প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং সংসদ ভেঙে দেন, যার মধ্য দিয়ে ২৫ অক্টোবরের আগাম নির্বাচনের পথ তৈরি হয়।
প্রেসিডেন্ট থাকাকালে বিশ্লেষকদের মতে তিনি সব সময় পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রেখে চলেছেন। ২০১৪ সালে ইইউতে যোগদানের আলোচনা শুরু করে ইউরোপীয় বৈধ্যতা খুঁজেছেন, আবার ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পরও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।
এই নির্বাচন আগেরগুলোর চেয়ে আলাদা, কারণ ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিরোধীরা তাদের দাবির প্রতি উল্লেখযোগ্য মনোযোগ টানতে পেরেছে এবং জনসমর্থন জড়ো করে একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ আন্দোলন থেকে বৈধ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছে।
সার্বিয়ায় ছাত্র-নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভ চলছে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে। নোভি সাদ শহরে রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর পর ন্যায় ও জবাবদিহির দাবিতে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ বেলগ্রেডের স্লাভিয়া স্কয়ারে প্রায় তিন লাখ ৫০ হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিলেন, যা সার্বিয়ার ইতিহাসের অন্যতম বড় প্রতিবাদ।
বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেছেন, ছাউনি বিপর্যয়ের জন্য কাউকে দায়ী করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালিয়ে গেছে। তাদের মূল দাবিগুলোর কোনোটাই পূরণ না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা নির্বাচনী রাজনীতির দিকে ঝুঁকেছে—যে পরিবর্তন সার্বিয়ার রাজনৈতিক বিরোধী দল কোনো দিন আনতে পারেনি, সেটাই তারা আনতে চায়।
স্টুডেন্ট লিস্ট নামে পরিচিত এই বিরোধী শক্তিতে নাগরিক সমাজের বিস্তৃত অংশ আছে, যাদের অনেকেই শিক্ষাঙ্গন থেকে এসেছেন। তবে এতে সার্বিয়ার ঐতিহ্যবাহী বিরোধী দলগুলোর কেউ নেই, যারা অতীতে ভুচিচ ও তার ক্ষমতাসীন সার্বিয়ান প্রোগ্রেসিভ পার্টিকে চ্যালেঞ্জ করতে হিমশিম খেয়েছে। দলটি বিকেন্দ্রীভূতভাবে কাজ করে, এর কোনো আনুষ্ঠানিক নেতা নেই, আর মূল অগ্রাধিকার দুর্নীতি মোকাবিলা এবং স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা।
বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ফিলিপ উবোভিচ বলেছেন, দেশের বর্তমান অবস্থায় বিরক্ত হয়েই তিনি বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। তার মতে, মানুষ অনেক দিন ধরেই যথেষ্ট সহ্য করেছে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের পুরোপুরি গ্রহণ করেছে কারণ তারা তাদের নিজেদের সন্তান, তরুণ, পেশাদার রাজনীতিবিদ নন, তাদের কোনো একক মুখ নেই এবং তারা অত্যন্ত পেশাদার ও নীতিনিষ্ঠ।
এখন পরীক্ষা হলো, স্টুডেন্ট লিস্ট রাজপথের জনসমাবেশকে একটি কার্যকর রাজনৈতিক বিকল্পে রূপ দিতে পারে কি না—এমন একটি দেশে নির্বাচনে জিতে সরকার চালাতে পারে কি না, যেখানে এক দশকের বেশি সময় ধরে কোনো রাজনৈতিক পালাবদল হয়নি। তারা জিতলে সার্বিয়ার পররাষ্ট্রনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কোন দিকে যাবে, তাও এখনো স্পষ্ট নয়; জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিসা ভুকোভিচের মতে, শিক্ষার্থীরা এখন পর্যন্ত বর্তমান সরকারের ধারা থেকে সরে যাওয়ার মতো পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য নির্ধারণে অনিচ্ছুক, তাই ধারাবাহিকতাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা।




