দুই সপ্তাহের অবরোধে বন্দি মাদামা গ্রাম: স্কুল-হাসপাতাল বন্ধ, জলপাইয়ের মৌসুম শেষ
অধিকৃত পশ্চিম তীরের নাবলুসের দক্ষিণে মাদামা গ্রাম। আড়াই হাজারের বেশি মানুষের এই গ্রামের চারটি প্রবেশপথই ১১ অক্টোবর থেকে মাটির বাঁধ দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। ‘নিরাপত্তার কারণ’ দেখিয়ে দেওয়া এই অবরোধে গ্রামবাসীর কাজ, স্কুল আর হাসপাতালে যাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে; বন্ধ হয়ে গেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সরবরাহও।
গ্রামের বাসিন্দা ওয়াইল কুতের বয়স ৪২। তিনি রামাল্লায় জেরুজালেম লিগ্যাল এইড অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সেন্টারে আইনি পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। অবরোধের আগে প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াত করতেন তিনি; এখন দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ঘরেই আটকে আছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনারা গ্রামবাসীকে জানিয়েছে—ফিলিস্তিনি কৃষকেরা নিজেদের জমিতে যাওয়ার চেষ্টা বন্ধ না করলে এই বিধিনিষেধ থাকবে। গ্রামের উত্তরাংশে একটি অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের চৌকি রয়েছে, আর সেই জমি ঘিরেই মূল টানাপোড়েন।
২০ অক্টোবর সেনাবাহিনী কয়েক ঘণ্টার জন্য উত্তর দিকের প্রবেশপথটি খুলে দিয়েছিল; তারপর আবার বন্ধ করে দেয়। এর মধ্যে গ্রামবাসী মাদামা ও আসিরার মধ্যে একটি কাঁচা মাটির পথ পরিষ্কার করে কোনোভাবে যাতায়াতের চেষ্টা করেছিলেন। কুত সেই পথ দিয়েই একবার রামাল্লায় গিয়েছিলেন জরুরি মামলার নথির কাজে। তাঁর কথায়, পথটি ছিল ‘বিপজ্জনক বাজি’—এলাকাজুড়ে বসতি স্থাপনকারীদের আনাগোনা, আর অধিকাংশ যানবাহনের জন্য পথটি চলাচলের উপযোগীও নয়।
গ্রামবাসী ওই পথ দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করলেই সেনাবাহিনী ড্রোন দিয়ে নজরদারি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সৈন্যরা বাসিন্দাদের ওপর হামলা করেছে এবং সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে তাদের ফিরিয়ে দিয়েছে বলেও জানিয়েছেন বাসিন্দারা। পরে সেনারা সেই মাটির পথটিও বন্ধ করে দেয়—ফলে বাইরে বেরোনোর শেষ ছোট সুযোগটুকুও হারিয়ে ফেলেন গ্রামবাসী। কুত নিজে কয়েক দিন রামাল্লায় আটকে থেকে উত্তর প্রবেশপথ সাময়িকভাবে খোলার খবর পেয়ে তবেই বাড়ি ফিরতে পেরেছিলেন।
অবরোধের সঙ্গে চলেছে বুলডোজার দিয়ে জমি সমতল করার কাজও। বাসিন্দাদের অভিযোগ, কৃষিজমি ধ্বংস করা হয়েছে এবং শত শত জলপাইগাছ উপড়ে ফেলা হয়েছে। সময়টা বার্ষিক জলপাই তোলার মৌসুম—যা স্থানীয় কৃষকদের আয়ের প্রধান ভরসা। দৃশ্যগুলোকে বাসিন্দারা বলছেন ‘ভয়াবহ’।
মাদামা গ্রাম পরিষদের প্রধান রামি নাসার জানিয়েছেন, গ্রামটির আয়তন প্রায় ৩৪০ হেক্টর (৮৪০ একর)। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশকে অবৈধ ইয়িতজার বসতি গড়তে গ্রামের জমি দখল করেছিল ইসরায়েল; ১৯৯০-এর দশকে আরেক অংশ নেওয়া হয় শুধু বসতি স্থাপনকারীদের জন্য নির্মিত সড়ক ‘রুট ৬০’ তৈরিতে, যা এখন বাসিন্দাদের কৃষিজমিতে যাতায়াত সীমিত করে দিয়েছে।
গত এপ্রিলে আল-মুরাব্বা চেকপয়েন্টের কাছে গ্রামের উত্তর-পশ্চিমে আরেকটি অবৈধ পশুপালন বসতি গড়ে ওঠে। নাসারের অভিযোগ, তখন থেকে বসতি স্থাপনকারীরা গ্রামের বিদ্যুৎ ও পানির লাইন থেকে সুবিধা নিচ্ছে এবং কৃষকের ফসল ধ্বংস করছে। গত জুলাইয়ে সেনাবাহিনীর সুরক্ষায় বসতি স্থাপনকারীদের বুলডোজার গ্রামের উত্তর-পশ্চিমে আনুমানিক ৫৭ হেক্টর (১৪০ একর) জমি সমতল করে শত শত ফলবতী জলপাইগাছ উপড়ে ফেলেছিল বলেও জানান তিনি।
চলতি জলপাই মৌসুমে সৈন্যরা কৃষকদের মাঠ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে; যারা কোনোভাবে জমিতে পৌঁছাতে পেরেছেন, তাদের তোলা জলপাই ও কৃষি সরঞ্জাম বসতি স্থাপনকারীরা লুট করেছে বলেও অভিযোগ করেছেন নাসার। তাঁর কথায়, ‘মাদামার মানুষের জন্য জলপাই তোলার মৌসুম শেষ হয়ে গেছে—যে মৌসুমের ওপর তারা পুরোপুরি নির্ভর করে, বিশেষ করে এই কঠিন জীবনযাত্রার মধ্যে। প্রতিবছর এই ফসল তোলা ছিল উৎসবের মতো; এখন আমরা শুধু বুলডোজার আর গাছ উপড়ে ফেলাই দেখছি।’
অবরোধের সবচেয়ে মানবিক আঘাত এসেছে চিকিৎসা ও চলাচলে। কর্মস্থল, স্কুল ও হাসপাতালে যাওয়া বন্ধ; রান্নার গ্যাসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সরবরাহও ঢুকতে পারছে না। নাসার স্মরণ করেন, কয়েক দিন আগে এক বাসিন্দার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। গ্রামের চিকিৎসক হিসেবে তিনি নিজেই রোগীকে মাটির বাঁধের ওপর দিয়ে বয়ে, জলপাই বাগান আর খাড়া ঢাল পেরিয়ে, বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে করে নিকটবর্তী হাসপাতালে পৌঁছে দেন—যেতে সময় লেগেছিল দুই ঘণ্টার বেশি।
শিক্ষাজীবনও বিপর্যস্ত। শিক্ষকদের চলাচলে বিধিনিষেধের সঙ্গে মিলিয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অবরোধের পর মাদামা, বুরিন ও আসিরার তিনটি স্কুল তিন দিন অনলাইন ক্লাসে যেতে বাধ্য হয়; বন্ধ দীর্ঘ হওয়ায় পরে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পায়ে হেঁটে মাটির বাঁধ পেরিয়ে স্কুলে পৌঁছাতে হয়েছে।
আসিরার আল-ফাইহা কিন্ডারগার্টেনের অধ্যক্ষ মারিয়াম রায়ান (৪৮) জানান, তাঁর স্কুলে ভর্তি শিশুদের মধ্যে ৩৫ জন মাদামার বাসিন্দা। তিনি থাকেন পাশের বুরিন গ্রামে; সেখান থেকে মাদামা হয়ে আসিরায় পৌঁছাতে সাধারণত আট মিনিটের বেশি লাগে না—এখন লাগছে দেড় ঘণ্টার বেশি। তাঁর বর্ণনায়, কিন্ডারগার্টেনের বাস মাটির বাঁধের কাছে থামে, আশপাশে সৈন্য বা বসতি স্থাপনকারী নেই নিশ্চিত হওয়ার পর গ্রামের ভেতর থেকে শাটলে করে শিশুরা আসে; তিনি পায়ে হেঁটে বাঁধ পেরিয়ে একে একে শিশুদের পার করে দেন। ফেরার পথেও একই প্রক্রিয়া। ২৫ বছর শিক্ষকতা করে এমন কঠিন পরিস্থিতি তিনি দেখেননি; স্কুলের ১৩৫ শিশুর জীবনের দায়িত্ব মাথায় নিয়ে প্রতিদিন তাঁকে আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে বলে জানান রায়ান।
বৃহস্পতিবার ইসরায়েল মাদামার উত্তর প্রবেশপথ আবার খুলে দিয়েছে, তবে বাকি প্রবেশপথগুলো এখনো বন্ধ; ফিলিস্তিনিদের আশঙ্কা, যেকোনো মুহূর্তে এটিও আবার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। শুক্রবার হেবরনে দুই সৈন্য নিহত হওয়ার হামলার পর ইসরায়েল পশ্চিম তীরজুড়ে ব্যাপক চলাচল-নিষেধাজ্ঞা শুরু করেছে, এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পুরো অধিকৃত এলাকায় ‘পূর্ণ লকডাউন’ ও বড় অভিযানের প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়েছেন—ফলে মাদামার অবরোধ আরও কঠোর হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
জাতিসংঘের মানবিক সমন্বয় দপ্তর ওসিএইচএর হিসাবে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের চলাচল বাধাগ্রস্তকারী ৯২৫টি ভৌত প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত হয়েছে, যার মধ্যে ১৬৭টি মাটির বাঁধ; এগুলোর প্রভাব পড়ছে প্রায় ৩৪ লাখ ফিলিস্তিনির চলাচলে। সংস্থাটি বলছে, এসব বাধা গ্রাম, শহর ও প্রধান সড়কের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বাসিন্দাদের দীর্ঘ বিকল্প পথ নিতে বাধ্য করছে এবং কর্মস্থল, জরুরি সেবা ও কৃষিজমিতে পৌঁছানো সীমিত করছে। এ বিষয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মন্তব্য চাওয়া হলেও এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। মাদামার মানুষের জন্য আপাতত প্রতিটি দিনই অনিশ্চয়তার—প্রবেশপথ কবে সত্যিকার অর্থে খুলবে, তা কেউ জানে না।




