প্লাস্টিক জমা দিলেই মিলছে গাছের চারা: পাকুন্দিয়ায় 'প্রয়াস'-এর ব্যতিক্রমী উদ্যোগে সাড়া সবার
প্লাস্টিক বর্জ্য জমা দিলেই মিলছে গাছের চারা। প্লাস্টিক দূষণ রোধ ও বৃক্ষরোপণে মানুষকে উৎসাহিত করতে এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন 'প্রয়াস'।
শুক্রবার বিকেলে পাকুন্দিয়া সদর ঈদগাহ মাঠে আয়োজিত 'প্লাস্টিকের বিনিময়ে বৃক্ষ' কর্মসূচিতে প্রায় ৭০০টি ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করা হয়।
কর্মসূচির নিয়ম ছিল সহজ—তিনটি প্লাস্টিকের বোতল কিংবা নির্ধারিত পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য জমা দিলেই একটি করে গাছের চারা। বাড়িতে জমিয়ে রাখা প্লাস্টিকের বোতল ও অন্যান্য প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে কর্মসূচিতে হাজির হন নারী, পুরুষ, শিক্ষার্থী ও শিশুসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগে স্থানীয়দের ব্যাপক সাড়া দেখা যায়।
আয়োজকদের মতে, প্লাস্টিক ও পলিথিনের ইচ্ছামতো ব্যবহার এবং যত্রতত্র ফেলে দেওয়ার প্রবণতা পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু সচেতনতামূলক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনাই এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।
কর্মসূচিতে সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা পরিবেশ সংরক্ষণে প্লাস্টিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার ও বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, পরিবেশ রক্ষা কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট সংগঠনের একক দায়িত্ব নয়; এটি সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। প্লাস্টিক বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে জমা রাখা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করা এবং বেশি করে গাছ লাগানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবির ছয়টি প্লাস্টিকের বোতল জমা দিয়ে দুটি গাছের চারা পেয়েছে। সে বলে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে যেমন প্লাস্টিক বর্জ্য সম্পর্কে সমাজে সচেতনতা তৈরি হবে, অন্যদিকে গাছ লাগানোর মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে। তার ভাষায়, গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, ফুল-ফল দেয় এবং পরিবেশকে সুন্দর রাখে। 'প্রয়াস'-এর এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগের জন্য সে ধন্যবাদ জানায়।
আয়েশা নামে এক গৃহিণী ১২টি প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে কর্মসূচিতে অংশ নেন। তিনি বলেন, বাসায় ব্যবহারের পর প্লাস্টিকের বোতল ও পলিথিন অনেক সময় যত্রতত্র ফেলে দেওয়া হয়, এতে পরিবেশের ক্ষতি হয়। ফেসবুকে দেখেছেন, এখানে বোতল জমা দিয়ে গাছের চারা দেওয়া হবে। তাই তিনিও এসেছেন এবং গাছের চারা নিতে পেরে খুব ভালো লাগছে বলে জানান।
সংগঠনটির আহ্বায়ক নূরুল জান্নাত মান্না বলেন, 'প্রয়াসের উদ্যোগে আমরা প্লাস্টিকের বিনিময়ে বৃক্ষ কর্মসূচির আয়োজন করেছি। এর মূল উদ্দেশ্য প্লাস্টিক বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা এবং বেশি বেশি বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে উৎসাহিত করা। এই কর্মসূচির আওতায় আমরা প্রায় ৭০০টি গাছের চারা বিতরণ করেছি। অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছি। এই সাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে আমাদের অনুপ্রাণিত করবে।'
পাকুন্দিয়া পৌর বিএনপির সভাপতি এ এস এম মিনহাজ উদ্দিন বলেন, ভালো কাজ করতে গেলে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। তবে এসব সমালোচনায় কান না দিয়ে জনসচেতনতামূলক ভালো উদ্যোগগুলো এগিয়ে নিতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় 'প্রয়াস'-এর এই উদ্যোগকে তিনি প্রশংসনীয় বলে মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, প্লাস্টিক ও পলিথিন পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। এসব বর্জ্য মাটিতে মিশে যেতে শত শত বছর সময় লাগতে পারে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্লাস্টিক বর্জ্য নদী ও সাগরে গিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করছে। তাই যত্রতত্র প্লাস্টিক না ফেলে সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপর তিনি জোর দেন।
আয়োজকরা জানিয়েছেন, স্থানীয়দের এমন সাড়া পেয়ে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এ ধরনের কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের পাশাপাশি বিতরণ করা চারাগুলো যেন যত্নে বড় হয়, সেদিকেও নজর রাখার কথা ভাবছেন তারা।
পরিবেশবিদদের মতে, শুধু সচেতনতামূলক প্রচার দিয়ে প্লাস্টিক দূষণ রোধ করা কঠিন; পাকুন্দিয়ার এই উদ্যোগের মতো প্রণোদনাভিত্তিক অংশগ্রহণ মানুষের অভ্যাস বদলে দিতে পারে। বর্জ্যের বিনিময়ে সবুজ পাওয়ার এই সহজ হিসাব ছড়িয়ে পড়লে গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।




