লন্ডনে সাইফুজ্জামানের ভাইয়ের ২৪০ কোটি টাকার ফ্ল্যাট জব্দের আদেশ হাইকোর্টের
যুক্তরাজ্যের লন্ডনে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী রনির ১৫ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছেন লন্ডনের হাইকোর্ট। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই সম্পত্তির মূল্য প্রায় ২৪০ কোটি টাকা।
অর্থ পাচার, আত্মসাৎ ও জালিয়াতির অভিযোগে যুক্তরাজ্যের জাতীয় অপরাধ সংস্থার (এনসিএ) আবেদনের ভিত্তিতে এই আদেশ দেওয়া হয়। লন্ডনের লর্ডসের কাছাকাছি রিজেন্টস পার্ক এলাকার এই সম্পত্তিটির হস্তান্তর বা বিক্রির ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর এনসিএ আনিসুজ্জামান চৌধুরীকে ফ্ল্যাট কেনার অর্থের বৈধ উৎস জানানোর নির্দেশ দিয়েছিল। তবে তিনি তা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় যুক্তরাজ্যের দুর্নীতিবিরোধী আইন অনুযায়ী ফ্ল্যাটটি অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়।
এনসিএর তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে জানান, আনিসুজ্জামান চৌধুরী তাঁর 'রনি ৪২ লিমিটেড' কোম্পানির নামে ২০১৩ সালে ১২ দশমিক ৪ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়ে ফ্ল্যাটটি কেনেন। তদন্ত এড়াতে এবং ফ্ল্যাটের প্রকৃত মালিকানা গোপন করতে তিনি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মাত্র ১ পাউন্ডের বিনিময়ে তৃতীয় পক্ষের নামে এটি হস্তান্তরের নাটক করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঘুরেফিরে এর নিয়ন্ত্রণ পরবর্তীতে তাঁর স্ত্রী ও দুই কন্যার হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগটি হলো, এই জালিয়াতির প্রক্রিয়ায় যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং জনপ্রিয় মার্কিন সংগীতশিল্পী ক্রিস ব্রাউনের ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়—যা আইনি নথি ও দলিলে তাঁদের চরম জালিয়াতির মানসিকতা প্রকাশ করে বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।
বিচারপতি কারেন স্টেইন আদালতে বলেন, এই সম্পত্তির উৎস যে অবৈধ অর্থ, তার যথেষ্ট যুক্তিসংগত প্রমাণ রয়েছে। তাই সম্পত্তিটি জব্দ করার আদেশ জারি করা হলো।
অভিযুক্ত আনিসুজ্জামান চৌধুরীর আইনজীবীরা এই আবেদনের বিরোধিতা করেননি। তবে আনিসুজ্জামান ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, আইনি পরামর্শের ভিত্তিতেই তিনি সম্পত্তি জব্দের আবেদনের বিরোধিতা করেননি। তাঁর দাবি, তিনি কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত নন এবং এনসিএ দেওয়ানি মামলা করলে তিনি আইনগতভাবে লড়াই করবেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশ থেকে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ ফিরিয়ে আনতে জোর তৎপরতা শুরু করে। সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে এর আগেও বিদেশে অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ ওঠে।
এনসিএর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পরিবারের বিদেশি সম্পত্তির মূল্য প্রায় ২৯৫ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
চলমান সিভিল তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাজ্যের এনসিএ সাইফুজ্জামান চৌধুরীর মালিকানাধীন প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন পাউন্ডের সম্পত্তি ইতিমধ্যে জব্দ করেছে। আনিসুজ্জামান চৌধুরী তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের বিষয়টি অস্বীকার করলেও যুক্তরাজ্যের তদন্তকারী সংস্থাগুলো পুরো পরিবারের বিরুদ্ধে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ ফেরত আনার প্রচেষ্টা চলছে। লন্ডনের আদালতের এই সর্বশেষ আদেশ সেই প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। আনিসুজ্জামান চৌধুরী দেওয়ানি মামলায় আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা দেওয়ায় এই সম্পত্তি নিয়ে মামলার পরবর্তী ধাপের দিকে এখন সবার নজর থাকবে।





