গাইবান্ধার চরে কয়েলের আগুনে পশু বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ গেল কৃষক খোরশেদ আলীর, পুড়ে মরল ৯টি গরু-ছাগল
গাইবান্ধার সাঘাটায় যমুনার দুর্গম চরে মশার কয়েল থেকে লাগা আগুনে পুড়ে মারা গেছেন খোরশেদ আলী (৬৫) নামের এক কৃষক। নিজের গরু-ছাগল বাঁচাতে গিয়েই দগ্ধ হন তিনি। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাতে সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের চর হলদিয়ায় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
আগুনে খোরশেদ আলীর ৩টি গরু ও ৬টি ছাগল পুড়ে মারা গেছে। এ ছাড়া আরও ৩টি গরু ও ৪টি ছাগল দগ্ধ হয়েছে। অর্থাৎ যে পশুগুলো বাঁচাতে গিয়ে তিনি আগুনের মধ্যে ছুটে গিয়েছিলেন, সেগুলোর বেশির ভাগকেই বাঁচানো যায়নি।
নিহত খোরশেদ আলী ওই চরের মৃত আব্দুল গফুর আলীর ছেলে। কৃষিকাজের পাশাপাশি তিনি ছয়টি গরু ও ১০টি ছাগল পালন করতেন; গবাদিপশু লালনপালন করেই চলত তার সংসার। পশুর খাবার জোগাড় করতে প্রায়ই তাকে বাড়ির বাইরে যেতে হতো।
জানা গেছে, সম্প্রতি তার গরুর জন্য রাখা খড় শেষ হয়ে যায়, আর অন্য বছরের তুলনায় এবার খড়ের দামও বেশি। তাই বছরের এই সময়ে গবাদিপশু নিয়ে যমুনার চরে গিয়ে থাকতেন তিনি। চরের ঘাসই ছিল পশুর খাবারের ভরসা।
যমুনার বুকে জেগে ওঠা চর হলদিয়ায় একটি খুপরিঘর তৈরি করে সেখানেই গরু-ছাগল পালন করতেন খোরশেদ আলী। নদীর ওপারে পশ্চিম হলদিয়ায় থাকত তার পরিবার। চরে তিনি থাকতেন একা—পশুগুলোই ছিল তার সঙ্গী আর জীবিকার অবলম্বন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সন্ধ্যায় খুপরিঘরে গরু-ছাগল রেখে মশার কয়েল জ্বালিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন খোরশেদ আলী। রাতে সেই কয়েলের আগুন থেকে ঘরে আগুন ধরে যায়। আগুনের উত্তাপে ঘুম ভেঙে গেলে চিৎকার শুরু করেন তিনি।
ঘুম ভাঙার পর নিজে বেরিয়ে আসার সুযোগ থাকলেও খোরশেদ আলী ছুটে যান পশুগুলোকে উদ্ধার করতে। নিজের গরু-ছাগল বের করে আনার চেষ্টা করেন তিনি। একপর্যায়ে আগুনে দগ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এই বৃদ্ধ কৃষক।
দুর্গম চরের অবস্থানই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তোলে। বিস্তীর্ণ চরে খোরশেদ আলীর খুপরিঘরটিই ছিল একমাত্র ঘর; আশপাশের প্রায় ৫০০ মিটারের মধ্যে আর কোনো বসতি ছিল না। ফলে আগুন লাগার পরপরই সেখানে সাহায্য পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
পরে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে আগুন নেভান। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় খোরশেদ আলীর মরদেহ। তার একমাত্র জীবিকা আর জীবন—দুটোই শেষ হয়ে যায় একই রাতের আগুনে।
স্থানীয়রা জানান, আগুনে পুড়ে খুপরিঘরটি ছাইয়ের স্তূপে পরিণত হয়। সেখানে পড়ে ছিল পুড়ে যাওয়া গরু ও ছাগলের দেহ। পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল বৃদ্ধ কৃষকের ব্যবহৃত কিছু পোশাক—ঘটনাস্থলের এই চিত্রই বলে দেয় আগুন কতটা ভয়াবহ ছিল।
নিহতের ছেলে শাহ আলম বলেন, ‘বাবা গরু-ছাগল নিয়ে নদীর ওপারে চরে থাকতেন। সারাদিন চরে গরু চরাতেন। আমরা এপারে থাকি। রাতে তার চাচা আব্দুর রাজ্জাক ফোন করে বাবার মৃত্যুর খবর জানান।’ পরিবারের কাছে মৃত্যুসংবাদ পৌঁছায় ফোনেই, নদীর ওপার থেকে।
হলদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মাসুদ রানা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘ঘটনাটি সত্যিই দুঃখজনক। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। গবাদিপশু নিয়ে খোরশেদ আলী একই ঘরে থাকতেন।’ তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মশার কয়েল থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।
সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ঘটনাটি শুনেছি, খোঁজখবরও নিয়েছি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।’ পশু হারিয়ে নিঃস্ব এই পরিবারটির জন্য সেই সহায়তাই এখন একমাত্র ভরসা।


