সাধারণ স্কুলে কমছে শিক্ষার্থী, বাড়ছে মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমে: ব্যানবেইসের তথ্যে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গভীর প্রশ্ন
বাংলাদেশের সাধারণ বাংলা মাধ্যমের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিপজ্জনকভাবে কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থী বাড়ছে — বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রবণতা চলছিল, তবে বলা হচ্ছে, চব্বিশের পর থেকে এই পরিবর্তনের গতি প্রবল বেগে বেড়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, সাধারণ শিক্ষার বদলে মাদ্রাসা শিক্ষা কেন এত প্রবল হয়ে দাঁড়াল, তা অনুসন্ধান করাও রাষ্ট্রের একটি বড় দায়িত্ব। কীভাবে এই শিক্ষাব্যবস্থা উৎসাহিত হলো এবং এর সঙ্গে রাজনীতির কী সম্পর্ক, সেগুলো খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করছেন শিক্ষা নিয়ে কাজ করা অনেকে।
যে দেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা, সেখানকার অফিস-আদালতসহ সর্বত্র বাংলা ভাষাতেই সব কাজকর্ম হওয়া উচিত — এমন যুক্তি তুলে বিভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখার বিপদ সম্পর্কে অনেকেই বহুদিন ধরে বলে আসছেন। দেশের প্রশাসন এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন খাতে মূলত বাংলা ভাষায় লেখাপড়া করা শিক্ষার্থীরাই চাকরি করে থাকেন।
অন্যদিকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়া শিক্ষার্থীরা অনেকেই বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে লেখাপড়া করে, ফলে তাদের মধ্যে দেশের প্রতি একধরনের বিরূপ মনোভাব দেখা যায় বলে আলোচনায় উঠে এসেছে। ইংরেজি মাধ্যমের প্রতিষ্ঠানগুলোতে মূলত উচ্চবিত্তদের সন্তানরাই পড়ার সামর্থ্য রাখে, আর এই শিক্ষার কারণে তারা দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে অনেকটাই বিযুক্ত হয়ে যায় বলেও মন্তব্য করা হয়েছে। তাদের জন্য দেশে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতে কিছু চাকরি থাকলেও স্বপ্নটা রচিত হয় মূলত বিদেশের জন্যই।
মাদ্রাসাশিক্ষার চিত্রটিও সরল নয়। মাদ্রাসা মাধ্যমেও নানা ধারার শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত। মাদ্রাসায় পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ তৈরি হলেও ব্যাংকিং ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তাদের জন্য তেমন কোনো ভবিষ্যৎ তৈরি হচ্ছে না। মাদ্রাসায় ভর্তির পেছনে রয়েছে দারিদ্র্য, ধর্মীয় প্রেরণা এবং শিক্ষাজীবন শেষে মসজিদ-মাদ্রাসায় ছোটখাটো চাকরির সম্ভাবনা; যাঁরা ওয়াজ মাহফিলে দক্ষতা অর্জন করেছেন, তাঁদের জন্য অর্থকরী ভবিষ্যৎ থাকলেও সেটি সীমিত ক্ষেত্রেই। ওই পরিসংখ্যান থেকে আরও জানা গেছে, মাদ্রাসাগুলোতেও দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে কোনো অভিন্ন সংস্কৃতি না থাকায় মূল্যবোধ তৈরির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের বিভাজন দেখা যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভিভাবক ও শিক্ষকদের নানা ধরনের অবহেলা। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় সত্যিকারের মূল্যবোধ গড়ে উঠছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। দু-চারটি ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ শিক্ষক বিদ্যালয়কে শুধু অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন — এমন কড়া মন্তব্যও এসেছে আলোচনায়।
কোচিং সেন্টার এখন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত। ভর্তির জন্য কোচিংয়ের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে সব স্তরে, আর প্রায় সব শিক্ষকই এই কোচিং-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দ্রুত অর্থ আয়ের জন্য শিক্ষকদের কাছে এর চেয়ে সহজ বিকল্প নেই — এমন বাস্তবতাই এই বিস্তারের পেছনে কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি সরকারি কর্তৃপক্ষ, ম্যানেজিং কমিটি, অভিভাবক এবং এলাকার প্রভাবশালীরা অবহেলা করে আসছেন। অন্যদিকে মাদ্রাসাশিক্ষার বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ঢুকে পড়াকে — প্রভাবশালী শিক্ষকদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া এই ব্যবস্থাকে আরও রুগ্ণ করে দিচ্ছে বলে মন্তব্য এসেছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে এখন নানা ধরনের অধিদপ্তর তৈরি হয়েছে — মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের জন্য একটি, মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য আরেকটি, ইংরেজি ও আরবি শিক্ষাব্যবস্থা তদারকির জন্যও আলাদা সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে। এসব অধিদপ্তরের বড় কর্মকর্তা এবং উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অনেকের বিরুদ্ধে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগও আলোচনায় এসেছে; স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও সদস্য ছাড়াও কিছু শিক্ষক এতে জড়িত বলে বলা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা অল্প বয়সে শিক্ষকের দুর্নীতি বুঝতে পারলে তার হাত থেকে তাদের রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে — এই সতর্কবার্তাও উঠে এসেছে।
বিভিন্ন মাদ্রাসা সম্পর্কে যেসব সংবাদ পাওয়া যায়, তাও উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করা হয়েছে — একটি নিপীড়নমূলক শিক্ষাব্যবস্থা সেখানে এখনো চালু আছে এবং শিশুরা শিক্ষকদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। সমস্যাটি গুরুতর, এমন মন্তব্য করা হয়েছে।
শিক্ষক নিয়োগে ব্যাপক ভ্রান্তি, কোচিং সেন্টারের উত্থান এবং সৃজনশীল পদ্ধতি প্রয়োগ করতে গিয়ে মুখস্থবিদ্যা প্রধান হয়ে ওঠা — এসব মিলিয়ে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আলোচনায় বলা হয়েছে। প্রচুর কলেজ স্থাপিত হলেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষকদের মান ক্রমেই নিম্নমুখী হয়েছে, আর নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও সরকারি দলের প্রভাব ব্যবস্থাকে আরও পঙ্গু করেছে। কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন কার্যকর হয়নি, পরে গঠিত অন্য শিক্ষা কমিশনগুলোও ক্ষতির কারণই রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
সমাধান হিসেবে বলা হচ্ছে, সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করতে একা সরকারের দ্বারা তা সম্ভব নয় — একদিকে শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে, অন্যদিকে সৎ মানুষের সমাজ গড়তে হবে। ফিনল্যান্ডের মতো শিক্ষায় অগ্রগামী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শেখার কথাও বলা হয়েছে; পৃথিবীর জানালা যখন খোলা, তখন কেন অন্য দেশের ভালো অভিজ্ঞতা নেওয়া হচ্ছে না — এই প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কালবিলম্ব না করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দিয়ে শেষ হয়েছে আলোচনাটি।




