ন্যাসার কেলেঙ্কারির এক দশক পরও বদল ধীর: জিমন্যাস্টদের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন ভুক্তভোগীরাই
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় জিমন্যাস্টিকস দলের সাবেক চিকিৎসক ল্যারি ন্যাসারের যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশের এক দশক পেরিয়ে গেলেও খেলাটিতে বদলের গতি খুবই ধীর — এমন অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী ও অধিকারকর্মীরা। ২০১৮ সালে ন্যাসারের সাজা বিশ্বজুড়ে জিমন্যাস্টিকসে হিসাব-নিকাশের ঝড় তুললেও, জিমন্যাস্টদের অনেকেই বলছেন, এখনো তাঁদের হতাশই হতে হচ্ছে।
দশ বছর আগে ইন্ডিয়ানাপোলিস স্টার পত্রিকা ন্যাসারের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ প্রকাশ করে। এরপর শত শত নারী তাঁর বিরুদ্ধে নিজেদের অভিযোগ নিয়ে এগিয়ে আসেন। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটিতেও কর্মরত ছিলেন ন্যাসার; শেষ পর্যন্ত তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাগারে যান।
তাঁর অপরাধ ফাঁস হওয়ার পর শুধু যৌন নয়, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন থেকেও তরুণ ক্রীড়াবিদদের রক্ষা করতে ব্যর্থতার প্রশ্নে বিশ্বের আরও অনেক দেশের জিমন্যাস্টিকস কর্তৃপক্ষকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। ন্যাসারের ঘটনা নথিভুক্ত সবচেয়ে ভয়াবহ হলেও, অন্যান্য দেশেও একই ধরনের ব্যর্থতার চিত্র বেরিয়ে আসে।
এই সপ্তাহে বিশ্ব জিমন্যাস্টিকস চ্যাম্পিয়নশিপ চলছে রটারডামের আহয় অ্যারেনায়। সেখান থেকে তিনটি ট্রাম স্টপ দূরে, একটি বড় হাউসবোটে জড়ো হয়ে ভুক্তভোগী ও অধিকারকর্মীরা বদলের ধীর গতি নিয়ে তাঁদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
ন্যাসার মামলার প্রভাব ছিল বিস্ফোরক, বিশেষ করে বিচারক রোজমেরি আকুইলিনার সিদ্ধান্তের কারণে — সাজা ঘোষণার আগে তিনি ভুক্তভোগীদের আদালতকক্ষে নিজেদের কথা বলার সুযোগ দেন। সাত দিন ধরে ১৬৯ জন মানুষ বক্তব্য দেন; বিশ্বজুড়ে মানুষ সেই আবেগঘন সাক্ষ্য শোনেন। আকুইলিনা ন্যাসারকে ১৭৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেন; অন্যান্য মামলার সাজা মিলিয়ে তাঁর মোট দণ্ড দাঁড়ায় ৩০০ বছর থেকে যাবজ্জীবন।
আকুইলিনার ভাষায়, ভুক্তভোগীরা প্রকাশ্যে কথা বললে তাঁদের কষ্ট ঝরে যায়, তাঁরা যেন আরও উঁচু হয়ে দাঁড়ান। শুরুতে মাত্র ডজনখানেক নামের তালিকা ছিল; পরে তা বেড়ে ২০, ৩০, শেষে ৮০, ১০০ ছাড়িয়ে যায়। একজন মেয়ে আরেকজনকে সাহস জুগিয়েছে — এটাই ছিল তাঁদের আরোগ্যের শুরু, কারণ নিরাপদ জায়গায় দাঁড়িয়ে তাঁরা প্রথমবার শোনা ও বিশ্বাস পাওয়ার অভিজ্ঞতা পেয়েছিলেন।
বক্তব্য দেওয়া ভুক্তভোগীদের মধ্যে ছিলেন অলিম্পিক স্বর্ণজয়ী অ্যালি রেইসম্যান, যিনি ন্যাসারকে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ইউএসএ জিমন্যাস্টিকসকে তীব্র ভাষায় দায়ী করেন। ছিলেন স্বর্ণজয়ী জর্ডিন উইবার, অলিম্পিক ব্রোঞ্জজয়ী জেমি ড্যান্টশার ও সাবেক জাতীয় চ্যাম্পিয়ন ম্যাটি লারসন। যাঁর অভিযোগ থেকে ন্যাসারের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ উঠেছিল, সেই ম্যাগি নিকোলসের পক্ষে তাঁর মা শক্তিশালী বক্তব্য পড়ে শোনান। প্রজন্মের সবচেয়ে বিখ্যাত জিমন্যাস্ট সিমোন বাইলস সামাজিক মাধ্যমে নিজের ভুক্তভোগী হওয়ার কথা জানান এবং পরে মার্কিন সিনেটের বিচার বিভাগীয় কমিটির সামনে সাক্ষ্য দেন।
ন্যাসারের সাজার দুই বছর পর নিকোলসের নামে 'অ্যাথলিট এ' নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র মুক্তি পায়। আনুগত্য, ভয় আর নীরবতার ঐতিহ্যবাহী কোচিং সংস্কৃতি কীভাবে ন্যাসারকে কাজ করার সুযোগ দিয়েছিল — তা তুলে ধরে এই ছবি বিশ্বজুড়ে আলোচনার দরজা খুলে দেয়।
কানাডার সাবেক জিমন্যাস্ট কিম শোর, যিনি ১৯৮০-এর দশকে সব ধরনের নির্যাতনের পাশাপাশি আনন্দের অভিজ্ঞতাও পেয়েছিলেন, পরে জিমন্যাস্টিকস কানাডার পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন। তাঁর ভাষায়, ন্যাসার মামলা তাঁকে বুঝিয়ে দেয় — তিনি খারাপ শিশু বা খারাপ জিমন্যাস্ট ছিলেন না; এই আচরণ ছিল পদ্ধতিগত। কিন্তু সংস্থাটির প্রতিক্রিয়া ছিল তাঁর মতে একেবারেই অপ্রতুল।
ব্রিটিশ জিমন্যাস্টিকসের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগে প্রথম দেওয়ানি মামলায় জয়ী এলোয়িস জোটিশকি (২৩) বলেন, প্রামাণ্যচিত্রটি তাঁকে নিজের অভিজ্ঞতাকে ভাষা দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। তাঁর বর্ণনায় এই খেলার সংস্কৃতি অনেকটা বন্ধ একটি ব্যবস্থার মতো — ক্রীড়াবিদকে স্কুল থেকে, বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়; এটি একটি শিশুর ক্ষেত্রে যত্নের দায়িত্ব জড়িত বলেই আরও গুরুতর।
সাবেক ব্রিটিশ জিমন্যাস্ট ক্লেয়ার হিফোর্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন 'জিমন্যাস্টস ফর চেঞ্জ' জোট, যার আন্তর্জাতিক শাখার প্রধান হিসেবে তিনি রটারডামে ভুক্তভোগী ও কর্মীদের একত্র করেছেন। তাঁর মতে, 'অ্যাথলিট এ' দেখিয়েছিল জিমন্যাস্টিকস আসলে নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার ওপর দাঁড়ানো একটি পরিবেশ, যেখানে প্রায় সবাই এর শিকার হয়েছেন এবং অনেকেই এটিকে প্রয়োজনীয় বলেও মেনে নিয়েছিলেন।
ন্যাসার মামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক প্রতিবেদন ও পদক্ষেপ আসে — এফবিআই নিজেদের তদন্ত পরিচালনাকে 'অমার্জনীয়' বলে স্বীকার করে, কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করে ইউএস সেন্টার ফর সেফস্পোর্ট, যদিও সেই সংস্থাটিও পরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। ইউএসএ জিমন্যাস্টিকস দুই বছরের কম সময়ে চারজন প্রেসিডেন্ট বদলায়, যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে স্বাধীন প্রতিবেদনের ৭০টি সুপারিশ গ্রহণের কথা জানায় এবং ক্রীড়াবিদদের অধিকার সনদ তৈরি করে। সংস্থাটি এখন বলছে, ২০১৮-১৯ সালে নতুন পর্ষদ ও নেতৃত্ব আসার পর থেকে ক্রীড়াবিদদের নিরাপত্তাই তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
তবু ভুক্তভোগীদের মূল প্রশ্নটি রয়ে গেছে — কাগজে-কলমে এত পদক্ষেপের পরও মাঠপর্যায়ে সংস্কৃতি কতটা বদলেছে? রটারডামের এই সমাবেশ থেকে উঠে আসা বার্তাটি স্পষ্ট: সাজা ও সংস্কারের এক দশক পরও অনেক জিমন্যাস্ট মনে করছেন, পরিবর্তনের গতি তাঁদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ধীর।






