এক দিনে শেয়ারের দর কমল ২৪ শতাংশ, আরও আড়াই হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে ভলভো
নগদ অর্থের সংকটে পড়েছে সুইডিশ গাড়ি নির্মাতা ভলভো কারস। তৃতীয় প্রান্তিকে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি লোকসান আর নগদ অর্থ ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার খবর প্রকাশের দিনই প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দর এক দিনে ২৪ শতাংশ কমে গেছে, নেমে এসেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
একই সঙ্গে ব্যয় কমানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিশ্বজুড়ে আরও ২ হাজার ৫০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে সুইডেনেই চাকরি হারাবেন প্রায় ২ হাজার কর্মী, বাকি প্রায় ৫০০ জন অন্যান্য দেশের।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) প্রকাশিত তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফলে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ভলভোর সমন্বিত পরিচালন লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩৭০ কোটি সুইডিশ ক্রোনা, যা প্রায় ৩৭ কোটি ৩০ লাখ ডলারের সমান।
অথচ এক বছর আগে ঠিক একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ৫৮০ কোটি ক্রোনা মুনাফা করেছিল। বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসেও লোকসানের অঙ্ক এত বড় হবে বলে ধারণা করা হয়নি, ফলে ফলাফল প্রকাশের পর বাজারে ধাক্কা লেগেছে আরও বেশি।
লোকসানের পাশাপাশি বেড়েছে নগদ অর্থ ব্যয়ের চাপও। এই প্রান্তিকে কোম্পানিটির নগদ অর্থ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮৯০ কোটি ক্রোনায়, যা আগের বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় দ্বিগুণ।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাকান স্যামুয়েলসন তৃতীয় প্রান্তিককে অত্যন্ত হতাশাজনক বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, এই ফল এমন একটি বছরের প্রতিফলন, যা প্রাথমিক প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে; তাই চলমান ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনায় আরও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
ছাঁটাইয়ের কাজ ২০২৭ সালের মাঝামাঝি শেষ করার লক্ষ্য ঠিক করেছে ভলভো। তবে ভবিষ্যতে আরও পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি প্রধান নির্বাহী।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, পরামর্শক চুক্তি বাতিল, স্বাভাবিকভাবে কর্মীসংখ্যা কমে আসা এবং নির্দিষ্ট কর্মীদের জন্য চাকরি ছাড়ার সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে নতুন ছাঁটাই কার্যকর করা হবে। এতে মোট কর্মীর প্রায় ৬ শতাংশ প্রভাবিত হবেন। এর আগেও প্রতিষ্ঠানটি আরও ৩ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছিল।
ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি আগামী বছরের শেষ নাগাদ পরোক্ষ ব্যয় ও পরিবর্তনশীল খরচ থেকে অতিরিক্ত ৫০০ কোটি ক্রোনা সাশ্রয়ের লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে ভলভো।
চীনা প্রতিষ্ঠান গিলির সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন ভলভো বৈদ্যুতিক গাড়ির অনিশ্চিত চাহিদা, শুল্কের চাপ এবং চীনের কঠিন বাজার পরিস্থিতির কারণে সংকটে পড়েছে। ইউরোপের অন্য গাড়ি নির্মাতারাও দুর্বল চাহিদা, চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তীব্র প্রতিযোগিতা আর কারখানার অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার চাপে রয়েছে; বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ফক্সভাগেন সর্বোচ্চ ১ লাখ কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছে এবং কয়েকটি কারখানা বন্ধের বিষয় বিবেচনা করছে।
সংকট মোকাবিলায় স্যামুয়েলসন ২০২৫ সালে অবসর থেকে ফিরে প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ব্যয় সংকোচন, আঞ্চলিক বাজারভিত্তিক কার্যক্রম আর গিলির সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। কোম্পানিটির মোট মুনাফার হারও এক বছরে ২০ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে।
ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনায় বড় ভূমিকা রাখার কথা ছিল নতুন বৈদ্যুতিক এসইউভি ইএক্স৬০-এর। কিন্তু ব্যাটারি সংযোজনের সমস্যায় গাড়িটির উৎপাদন পিছিয়ে গেছে। চলতি বছরে ৪০ হাজার গাড়ি তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও এখন পর্যন্ত তৈরি হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ইউনিট মাত্র।
এ মাসের শুরুতে ভলভো পুরো বছরের বিক্রির পরিমাণ ও নগদ অর্থ প্রবাহ নিয়ে দেওয়া পূর্বাভাসও প্রত্যাহার করে নিয়েছে। চীনের বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে মূল্যযুদ্ধে না জড়িয়ে মুনাফার হার রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে তৃতীয় প্রান্তিকে সেখানে তাদের আয় প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে।
স্যামুয়েলসন স্বীকার করেছেন, চীনে উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম আরও আগে স্থানীয় বাজারের উপযোগী করা দরকার ছিল। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কের প্রভাব মোকাবিলায় স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও আগে উপলব্ধি করা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আগামী বছর স্যামুয়েলসনের স্থলাভিষিক্ত হবেন স্কোডার সাবেক প্রধান ক্লাউস জেলমার। বিশ্লেষকদের মতে, ভলভোর সংকট কাটিয়ে ওঠার দায়িত্ব তাঁর জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটি দশকের শেষ নাগাদ ১৩টি নতুন গাড়ি বাজারে আনার পরিকল্পনা করছে, যার মধ্যে ছয়টি তৈরি হবে চীনের বাজারের জন্য।



