গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ছাড়া জাতীয় ঐক্য হবে না: গোলটেবিলে বিশিষ্টজনদের হুঁশিয়ারি
গণভোটে জনগণের রায়ের আট মাস পার হয়ে গেলেও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এ নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্টজনেরা। তাঁরা বলেছেন, গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং গুম-খুনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত না হলে দেশে টেকসই জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠবে না।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘জাতীয় ঐক্য: উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এই বৈঠকের আয়োজন করে ভিপিএসএসসি। এতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, সাবেক কূটনীতিক, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, আইনজীবী ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা অংশ নেন — সমাজের নানা স্তরের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বৈঠকটি রূপ নেয় জাতীয় পর্যায়ের এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায়।
বক্তারা বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কার্যকর জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠেনি। তাঁদের মতে, এটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় ব্যর্থতা। জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে বলেও মত দেন তাঁরা।
বৈঠকে সবচেয়ে ধারালো প্রশ্নটি রাখেন অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘বিচার কেন থমকে আছে? যারা বিচার করবে না, আমরা ধরে নেব তারাও গুম করবে।’ তাঁর এই মন্তব্যে গুম-খুনের বিচার নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রতিফলিত হয়।
দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘এত গুম, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরও বিচারপ্রক্রিয়া গতি পায়নি, যা দুঃখজনক। জুলাইয়ের আত্মত্যাগের আকাঙ্ক্ষা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।’ তাঁর অভিযোগ, বিএনপি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে একের পর এক জনবিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে এবং জনগণের ম্যান্ডেটকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই সনদ নিয়ে টালবাহানা চলছে। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে।’ বিশিষ্টজনদের আলোচনায় বারবার ফিরে এসেছে এই দাবি — সনদ বাস্তবায়নে বিলম্ব মানেই জনগণের রায়ের প্রতি অবজ্ঞা।
আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী আবেগঘন প্রশ্ন তোলেন, ‘আমাদের ছেলেরা আর কত রক্ত দেবে?’ তিনি বলেন, ‘এত রক্তের পরও দেশ বদলায়নি, এটা দুঃখজনক। বারবার জাতির সঙ্গে প্রতারণা করলে জাতি ক্ষমা করবে না।’ তাঁর মতে, কোনো রাজনৈতিক দলের ডাকে নয়, নিজেদের অধিকার ও আকাঙ্ক্ষা থেকেই মানুষ জুলাইয়ে রাজপথে নেমেছিল। সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক নয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলি বলেন, ‘বিএনপি দেশ ভালোভাবে চালালে জাতীয় ঐক্যের প্রসঙ্গই সামনে আসত না।’ জিয়াউর রহমানের শাসনামলেও জাতীয় ঐক্য ছিল না বলে মন্তব্য করেন তিনি — অর্থাৎ ঐক্যের সংকটকে তিনি দেখছেন দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে।
অধ্যাপক নাইমা মোয়াজ্জেম বলেন, ‘দুর্নীতি দেশের অন্যতম বড় সমস্যা। দলমত-নির্বিশেষে এটি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’ জনগণের নিরাপত্তা নেই উল্লেখ করে তিনি রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানান। তাঁর বক্তব্যে সংস্কারের প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিষ্ঠানগত পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ভিপিএসএসসির চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী। তিনি নিজেও গুমের শিকার হয়েছিলেন। গুমের ঘটনায় চলমান মামলায় চলতি বছরের এপ্রিলে তিনি আদালতে সাক্ষ্য দেন এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীর জেরার মুখোমুখি হন — ফলে বিচারের দাবি তাঁর কাছে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতারও প্রশ্ন।
সভাপতির বক্তব্যে আযমী বলেন, ‘রাজনৈতিক বিভাজন ও পারস্পরিক অবিশ্বাস দূর করে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’ তাঁর মতে, জাতীয় ঐক্য কেবল দলগুলোর সাময়িক সমঝোতার বিষয় নয়; এটি একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সাবেক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ দেন। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান বলেন, ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণ টেকসই করতে বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা জরুরি।’ উল্লেখ্য, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ দিনের মাথায় গত ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি উপাচার্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। সাবেক সচিব মোহাম্মদ মিয়া প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার ওপর জোর দেন।
সব বক্তার বক্তব্য মিলিয়ে বৈঠকের মূল বার্তা একটিই — গণভোটের রায়ের প্রতি সম্মান, জুলাই সনদের দ্রুত বাস্তবায়ন, সংস্কার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার ছাড়া জাতীয় ঐক্যের কথা অর্থহীন। এখন দেখার বিষয়, এই সতর্কবার্তার পর সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো বাস্তবায়নের পথে কতটা দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়।






