‘এই সংসদের কোনো মূল্য নেই, পাঁচ বছর টিকবে কি না সন্দেহ’—নাহিদ ইসলাম
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কোনো মূল্য নেই; এই সংসদে বিরোধী দলের বক্তব্য কিংবা জনগণের কণ্ঠস্বরের কোনো মূল্যায়ন নেই। সংসদটি এখন বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সংসদে পরিণত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি, এবং এমন পরিস্থিতিতে সংসদ পাঁচ বছর টিকবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ কর্মসূচিতে তিনি এসব কথা বলেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, জ্বালানি তেল ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে আগামী ৩০ অক্টোবর দলটির বিক্ষোভ সমাবেশ সফল করতে এ কর্মসূচির আয়োজন করে এনসিপি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘১৬ বছর পরে যে সংসদ নির্বাচন হয়েছে, যেই নতুন জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছিল, এই সংসদের মূল্য আর দুই আনাও নাই। এই জাতীয় সংসদ পাঁচ বছর টিকবে কি না, সন্দেহ আছে। কারণ এই জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের কথার কোনো মূল্যায়ন নাই। জনগণের কণ্ঠস্বরের কোনো মূল্যায়ন নাই। এই জাতীয় সংসদ হয়েছে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের সংসদ। সেটাই জাতীয় সংসদ, আর জনগণের জাতীয় সংসদ নাই।’
সংসদে জনগণের কথা বলার সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ তুলে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘আমরা মনে করি, সংসদে আপনারা আমাদের পাঠিয়েছিলেন আপনাদের কথা বলার জন্য। সেখানে যেহেতু আমরা বলতে পারছি না, আমরা আবারও রাজপথে এসে দাঁড়িয়েছি। আমরা আবার আপনাদের কাছে এসে দাঁড়িয়েছি।’
বর্তমান সরকারকে ‘গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী’ আখ্যা দিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘সরকার গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী একটি সরকার। যদিও বর্তমান সরকারে যারা রয়েছে বিএনপি, তারা সেই সময় গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে ছিল। ছাত্রদলের বহু নেতাকর্মী আহত ও নিহত হয়েছেন। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক নেতারা বিগত ১৬-১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপসে ছিলেন। ফলে আমরা দেখেছি, তাদের নেতাদের মধ্যে পরিবর্তনের কোনো আকাঙ্ক্ষা নাই। গত ৭-৮ মাসে তারা কোনো পরিবর্তন করেননি।’
গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘২০২৬ সালে যে নির্বাচন হয়েছে, সেই নির্বাচনে আপনারা দুটি ভোট দিয়েছিলেন। একটি গণভোট, আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট। সেই গণভোটে আপনারা-আমরা সবাই মিলে হ্যাঁ ভোট দিয়েছিলাম। আমরা বলেছিলাম, হ্যাঁ হচ্ছে পরিবর্তন ও সংস্কারের প্রতীক। কিন্তু আপনারা দেখেছেন, নির্বাচনের পর যেইমাত্র ক্ষমতায় এসেছে—তারা জুলাই সনদকে অবজ্ঞা করেছে, গণভোটকে অস্বীকার করেছে। গণভোটকে অস্বীকার করার মাধ্যমে তারা গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।’
বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আমরা বিএনপি সরকারকে একটি জুলাই গাদ্দার সরকার বলতে পারি। যারা জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে ভুলিয়ে-মিশিয়ে দিয়ে বাংলাদেশকে পুরোনো বন্দোবস্তে নিয়ে গেছে। যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হয়, যদি সংস্কার বাস্তবায়ন না হয়, যদি দেশে বৈষম্য দূর না হয়, যদি চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস দূর না হয়, তাহলে শেখ হাসিনা কী দোষ করেছিলেন—এটা কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ এখন বলতে শুরু করেছে।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারেক রহমান ও শেখ হাসিনার মধ্যে আর কোনো পার্থক্য নেই বলে তিনি মনে করেন। তার অভিযোগ, তারেক রহমান জনগণের ভোটাধিকার ও গণভোটের ভোটাধিকার হরণ করেছেন; কোনোরকম একটি নির্বাচন করে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে দেশকে মাফিয়াদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যার উদাহরণ সারা দেশে দেখা যাচ্ছে।
জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘দেশে এলপিজি গ্যাসের দাম সরকারি হিসাবে ১ হাজার ৮০০ টাকা। কিন্তু আপনি খুচরা বাজারে গেলে সেটা ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় কিনতে হবে—নির্বাচনের পরেও যেটা ১ হাজার ২০০ টাকা ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিশ্বযুদ্ধ পরিস্থিতি ছিল, পুলিশের ভঙ্গুর অবস্থা ছিল। কিন্তু সেই সময় ছাত্র-জনতা সবাই মাঠে ছিলাম এবং দেশের পরিস্থিতি এতটা খারাপ হয়নি।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘দেশে যে আজ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আপনারা নিজেরাই দেখতে পাচ্ছেন। আজ সকালেও আমরা দেখেছি, গায়ক আসিফ আকবরের গাড়িতে হামলা-ভাঙচুর হয়েছে। অর্থাৎ আপনি সমাজের যে স্তরের নাগরিকই হন না কেন, এই রাষ্ট্রে আপনার নিরাপত্তা নেই। এই সরকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছেন।’
মাদক কারবার ও চাঁদাবাজির সঙ্গে বিএনপি নেতাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘মাদকের সবচেয়ে বড় সিন্ডিকেট ও হটস্পটগুলো বিএনপির নেতাদের আওতায়, তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন। ফলে বিএনপির প্রতিমন্ত্রী যতই বন্দুক নিয়ে বের হোন, বিএনপি সরকারের পক্ষে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়।’ পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী এলাকায় প্রতিটি বাস ও রুটের গাড়ি থেকে চাঁদা নেওয়া হয়, আর সেই চাঁদার ভাগ কিছুটা আওয়ামী লীগ ও কিছুটা বিএনপি পায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জনগণকে আবারও রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, আপনারা আন্দোলন করতে করতে ক্লান্ত। গত ১৬ বছর আপনারা আন্দোলন করেছেন। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান বেহাত হয়েছে। গণঅভ্যুত্থান তারেক রহমান বেহাত করেছেন। সেই গণঅভ্যুত্থানকে আবার আমাদের নিজেদের কাছে নিয়ে আসার জন্য রাজপথে নামা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।’ ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে আসা ছাড়া বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন এনসিপি ৩০ অক্টোবরের বিক্ষোভ সমাবেশকে কেন্দ্র করে মাঠে সক্রিয় হচ্ছে। যাত্রাবাড়ীর গণসংযোগ থেকে দেওয়া সংসদ, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে তার কঠোর সমালোচনা আগামী দিনগুলোতে রাজনৈতিক আলোচনায় আরও জোরালো হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।




