ফুসফুসে রক্তজমাটে মৌসুম শেষ জেলেন হার্টসের, রক্ত পাতলা করার ওষুধে যে পাঁচ ভুল ডেকে আনতে পারে বিপদ
যুক্তরাষ্ট্রের তারকা কোয়ার্টারব্যাক জেলেন হার্টসের দুই ফুসফুসে রক্তজমাট ধরা পড়েছে, আর সেই কারণে তিনি ২০২৬ মৌসুমের বাকি অংশ খেলতে পারবেন না বলে জানিয়েছে এনএফএল। ফিলাডেলফিয়া ঈগলসের এই খেলোয়াড় এখন রক্ত পাতলা করার ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন, আর তাঁর এই অসুস্থতাই বিশ্বজুড়ে আলোচনায় নিয়ে এসেছে রক্তজমাট ও তা প্রতিরোধের ওষুধ ব্যবহারের নিয়মকানুন।
চিকিৎসকেরা বলছেন, তরুণ ও শারীরিকভাবে সক্রিয় মানুষেরও বিপজ্জনক রক্তজমাট বাঁধতে পারে, বিশেষ করে আঘাত, দীর্ঘ ভ্রমণ বা সাম্প্রতিক অস্ত্রোপচারের মতো ঝুঁকির কারণ একসঙ্গে মিললে। অ্যাটলান্টিকেয়ারের প্রধান চিকিৎসক ডা. জোসেফ ভি. লোম্বার্দি বলেন, “ফিট থাকলে ঝুঁকি কমে, কিন্তু তা থেকে কেউই মুক্ত নয়।”
রক্ত পাতলা করার ওষুধ বিপজ্জনক জমাট বড় হওয়া বা নতুন জমাট তৈরি ঠেকাতে সাহায্য করে, কিন্তু একই সঙ্গে আঘাতের পর শরীরের রক্তপাত বন্ধ করার ক্ষমতাও কমিয়ে দেয়। সংঘর্ষপ্রবণ খেলার ক্রীড়াবিদদের জন্য যেমন, তেমনি পড়ে যাওয়া বা আঘাত পাওয়া যেকোনো মানুষের জন্যও এটা উদ্বেগের বিষয়।
ইউনিভার্সিটি অব উটাহর হেমাটোলজিস্ট ও থ্রম্বোসিস বিশেষজ্ঞ ডা. ইয়াজান আবু-ইসমাইল বলেন, “ধারাবাহিকভাবে ওষুধ খাওয়া, সম্ভাব্য পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া বোঝা এবং সতর্ক সংকেতগুলো চিনতে পারা জটিলতার ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।” বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ওষুধ ব্যবহারে কয়েকটি সাধারণ ভুলই রোগীদের বিপদে ফেলে।
প্রথম ভুল হলো চিকিৎসকের সঙ্গে কথা না বলে ওষুধ বন্ধ করা বা মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়া। কোনো কোনো রোগীর কেবল সীমিত সময়ের জন্য ওষুধ লাগে, কারও লাগে দীর্ঘ মেয়াদে। লোম্বার্দি জানান, জমাটের স্পষ্ট কারণ থাকলে, যেমন আঘাত, চিকিৎসা সাধারণত প্রায় তিন মাস চলে। আবু-ইসমাইলের ভাষ্য, মেয়াদ নির্ভর করে চিকিৎসার কারণ ও আগের জমাটের ইতিহাসের ওপর; খুব তাড়াতাড়ি বন্ধ করলে নতুন জমাটের ঝুঁকি বাড়ে, আর নির্ধারিত সময়ের বেশি চালালে রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়ে।
দ্বিতীয় ভুল হলো বারবার ডোজ বাদ দেওয়া এবং পরে বাড়তি ডোজ খেয়ে তা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। আবু-ইসমাইল বলেন, বারবার ডোজ বাদ গেলে জমাটের বিরুদ্ধে ওষুধের সুরক্ষা দুর্বল হয়ে যায়, তবে ডোজ বাদ যাওয়ার পর কী করতে হবে তা নির্ভর করে নির্দিষ্ট ওষুধের ওপর। রোগীদের উচিত প্রেসক্রিপশনের নির্দেশনা মানা অথবা ফার্মাসিস্ট বা চিকিৎসককে ফোন করা, নিজে থেকে বাড়তি ডোজ না খাওয়া।
তৃতীয় ভুল হলো না জেনে অন্য ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট মেশানো। আবু-ইসমাইল সতর্ক করেছেন, অ্যাসপিরিন ও আইবুপ্রোফেনের মতো এনএসএআইডি রক্ত পাতলা করার ওষুধের সঙ্গে খেলে রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়ায়। কিছু প্রেসক্রিপশন ওষুধ ও মাছের তেল এবং হলুদের মতো সাপ্লিমেন্টও রক্তপাত বা ওষুধের মাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কাউন্টার থেকে কেনা হলেও, নতুন কিছু খাওয়ার আগে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টকে জিজ্ঞেস করা উচিত।
চতুর্থ ভুল হলো সতর্ক সংকেত উপেক্ষা করা। আবু-ইসমাইলের মতে, কিছুটা কালশিটে বা সামান্য রক্তপাত হতে পারে, কিন্তু নাক দিয়ে একটানা রক্ত পড়া, প্রস্রাবে রক্ত বা অকারণে কালশিটে বেড়ে গেলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি। নিয়ন্ত্রণহীন রক্তপাত, রক্তবমি, কালো বা আলকাতরার মতো মল, হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা, নতুন করে বিভ্রান্তি, দৃষ্টির পরিবর্তন বা কথা বলতে সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক জরুরি চিকিৎসা দরকার। মাথায় বড় আঘাতের পর প্রথমে ভালো লাগলেও চিকিৎসকের মূল্যায়ন নেওয়া উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
পঞ্চম ভুল হলো ঝুঁকিপূর্ণ খেলা বা কাজ আগের মতো চালিয়ে যাওয়া। জোরে আঘাত বা পড়ে যাওয়া এই ওষুধ সেবনকারীদের গুরুতর রক্তপাত ঘটাতে পারে, আর সেই কারণেই চিকিৎসা চলাকালে হার্টস ফুটবল খেলতে পারছেন না। চিকিৎসকেরা বলেন, রোগীরা ব্যায়াম চালিয়ে যেতে পারেন, তবে সংঘর্ষের খেলা ও আঘাতের উচ্চ ঝুঁকি আছে এমন কাজে অতিরিক্ত সতর্কতা দরকার এবং কোন কাজ নিরাপদ, তা চিকিৎসক দলের কাছে জেনে নেওয়া উচিত।
লোম্বার্দি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দিয়েছেন: রক্ত পাতলা করার ওষুধ বিদ্যমান জমাট গলিয়ে দেয় না। এটি জমাট বড় হওয়া ঠেকায়, আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীর নিজেই তা পরিষ্কার করে। সঠিক চিকিৎসা ও সতর্কতা ব্যক্তিভেদে আলাদা, তাই ডোজ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা কাজকর্ম নিয়ে প্রশ্ন থাকলে রোগীদের নিজের চিকিৎসক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
হার্টসের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফিটনেসও রক্তজমাটের ঝুঁকি থেকে কাউকে দূরে রাখে না। আর যাঁরা ইতিমধ্যে এই ওষুধ খাচ্ছেন, তাঁদের জন্য নিয়ম মেনে চলা আর সতর্ক সংকেত চেনাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।





