খুলনায় এক দিনে তিন গুলি-হামলা: সকালে যুবদল নেতা, সন্ধ্যায় দোকানি গুলিবিদ্ধ, রাতে সন্ধানী ক্লিনিকে ভাঙচুর
খুলনায় এক দিনেই তিনটি গুলি ও হামলার ঘটনায় পুরো নগরীতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার সকালে তেরখাদায় যুবদল নেতা রামিম বিশ্বাসকে, সন্ধ্যায় দক্ষিণ টুটপাড়ায় মুদিদোকানি ধনঞ্জয় কুণ্ডু ওরফে আকাশ কুণ্ডুকে গুলি করা হয়। রাত সোয়া নয়টার দিকে বাবুখান রোডে সন্ধানী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সে মুখোশধারীরা ফাঁকা গুলি ছুড়ে ভেতরে ঢুকে দুটি চেম্বারে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলা এই ধারাবাহিক সহিংসতায় জননিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
রাতের ঘটনাটি ঘটে খুলনা কমার্স কলেজের বিপরীতে, বাবুখান রোডের সন্ধানী ক্লিনিকে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রাত সাড়ে নয়টার দিকে মুখে মুখোশ পরা আট থেকে দশজন ব্যক্তি ক্লিনিকের ভেতরে প্রবেশ করে। অন্য বর্ণনায় সময়টি রাত সোয়া নয়টা বলা হয়েছে। দুর্বৃত্তরা প্রথমে ক্লিনিকের সামনে বা বিপরীত দিক থেকে এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। গুলির শব্দে আশপাশের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সড়কে থাকা মানুষ ছোটাছুটি শুরু করেন।
ভেতরে ঢুকে দুর্বৃত্তরা অধ্যাপক ডা. মো. কুতুবউদ্দিন মল্লিকের চেম্বারের সামনের কাচ ভাঙচুর করে। এরপর তারা ডা. মোয়াজ্জেম হোসেনের চেম্বারের সামনের কাচ এবং ভেতরের চেয়ার ও টেবিল ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে তারা ক্যাশ কাউন্টারের সামনে হামলা চালিয়ে সেখানকার সব কাচ ভেঙে দেয়। আতঙ্কিত চিকিৎসকেরা আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে যান, আর চিকিৎসা নিতে আসা মানুষেরা দিগ্বিদিক ছুটতে থাকেন।
হামলাকারীরা বেরিয়ে যাওয়ার সময় বাইরে থাকা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য আবার এক রাউন্ড গুলি করে পায়ে হেঁটে বাবুখান রোডের দিকে চলে যায় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এর আগে তারা ক্লিনিকের রিপোর্ট প্রদানকারী ইকবাল হোসেনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। একটি বর্ণনায় ক্লিনিকের কর্মকর্তা সুরেশ রায় আহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে; তবে পুলিশ বলেছে, ক্লিনিকের গুলি ও ভাঙচুরের ঘটনায় কেউ হতাহত হননি।
ক্লিনিকের সুপারভাইজার কল্যাণী বলেন, রাতে তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই কাজ করছিলেন। রাত সাড়ে নয়টার দিকে মুখোশ পরা কয়েকজন সামনে থেকে ভাঙচুর চালাতে চালাতে ক্যাশ কাউন্টারের সামনে এসে আক্রমণ করলে তাঁরা বাইরে বেরিয়ে যান। হামলাকারীরা চলে যাওয়ার পর তাঁরা আবার ভেতরে ফেরেন। তাঁর এই বর্ণনায় ঘটনার আকস্মিকতা ও কর্মীদের অসহায়ত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. লোকমান হোসেন বলেন, দুর্বৃত্তরা ক্লিনিকের সামনে ফাঁকা গুলি ছুড়ে ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর চালিয়েছে। তবে কী কারণে এই ঘটনা ঘটেছে, সে বিষয়ে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ কিছু জানাচ্ছে না। পুলিশ ঘটনার তদন্ত করছে। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পর থেকে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে পাওয়া যাচ্ছে না এবং তাদের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা মিলছে না; তদন্ত চলছে এবং জড়িত যেই হোক, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
এর আগে সন্ধ্যায় নগরীর দক্ষিণ টুটপাড়া গাছতলা এলাকায় নিজের দোকানে বসে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হন মুদিদোকানি ধনঞ্জয় কুণ্ডু ওরফে আকাশ কুণ্ডু (৪৫)। হঠাৎ চিৎকার করে তিনি জানান, তাঁর তলপেটে গুলি লেগেছে। স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ গুলির খোসা উদ্ধার করেছে।
ওসি লোকমান হোসেন বলেন, গুলির ধরন দেখে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, আকাশ কুণ্ডুকে হত্যার উদ্দেশ্যে নয়, ভয় দেখানোর জন্যই গুলি করা হয়ে থাকতে পারে। এলাকায় তিনি ভদ্র মানুষ হিসেবে পরিচিত। ঘটনার পেছনে চাঁদাবাজির বিষয় থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। জড়িতদের শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ করছে এবং বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
দিনের প্রথম ঘটনাটি ঘটে সকালে তেরখাদা উপজেলায়। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, যুবদল নেতা রামিম বিশ্বাস (৩২) ভ্যানে করে কোলাবাজারের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন। বেলা সোয়া এগারোটার দিকে সেনেরবাজার-মধুপুর সড়কের পারহাজীগ্রামে খান ব্রিকসের কাছে পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা পেছন থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুলি তাঁর পিঠে লাগে। আহত রামিম বিশ্বাসকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি তেরখাদা উপজেলার ছয় নম্বর মধুপুর ইউনিয়নের তিন নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি।
একই দিনে সকালে রাজনৈতিক নেতা, সন্ধ্যায় সাধারণ দোকানি এবং রাতে একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে হামলা — এই ধারাবাহিকতা খুলনার বাসিন্দাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। জনবহুল এলাকায়, একটি ক্লিনিকের মতো সংবেদনশীল স্থানে গুলি ও ভাঙচুরের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা এবং ক্লিনিকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং কারা, কী উদ্দেশ্যে এসব ঘটনা ঘটিয়েছে, তা উদ্ঘাটনে তদন্ত শুরু হয়েছে।
তিনটি ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। পুলিশ কোনো ঘটনারই সুনির্দিষ্ট কারণ বা জড়িতদের সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেনি। দোকানিকে গুলির ঘটনায় চাঁদাবাজির ধারণা থাকলেও যুবদল নেতাকে গুলি ও ক্লিনিকে হামলার কারণ অজানাই রয়ে গেছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্তে তিনটি ঘটনার রহস্য কত দ্রুত উন্মোচিত হয় এবং আতঙ্ক কাটিয়ে নগরীতে স্বাভাবিক নিরাপত্তাবোধ ফেরে কি না।




