১ জানুয়ারি থেকে ধাপে ধাপে এনইআইআর কার্যকরের পরিকল্পনা, ব্যবহৃত মোবাইল বৈধভাবে আমদানির সুযোগ চান ব্যবসায়ীরা
অবৈধ মোবাইল ফোনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকরের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। প্রথম ধাপে আগামী ১ জানুয়ারি থেকে অবৈধভাবে উৎপাদিত ও আমদানি করা ফোন শনাক্ত করে সেগুলোর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
এর আগেই বৈধভাবে সেকেন্ডহ্যান্ড বা ব্যবহৃত ফোন আমদানির সুযোগ চেয়েছেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, এতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে, ব্যবসায়ীরা সমান সুযোগ পাবেন এবং গ্রাহকেরা সাশ্রয়ী মূল্যে ফোন কেনার সুযোগ নিশ্চিত করতে পারবেন।
বিটিআরসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে অবৈধ ফোন শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা হলেও ক্লোন বা নকল আইএমইআই নম্বরের ফোন বন্ধ করা হবে না। সেই ব্যবস্থা যুক্ত হবে দ্বিতীয় ধাপে।
এনইআইআর হলো বিটিআরসি পরিচালিত একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে হ্যান্ডসেটের আইএমইআই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি) নম্বর যাচাই করা হয়। এর মাধ্যমে অবৈধ, নকল বা চুরি যাওয়া মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব।
আনঅফিশিয়াল মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীদের সংগঠন মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশের (এমবিসিবি) প্রচার সম্পাদক ও বসুন্ধরা সিটি শপিং মল মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান রানা বলেন, আনঅফিশিয়াল মোবাইল ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২০ লাখের বেশি মানুষ জড়িত।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আলোচনার বাইরে রেখে কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে বৈঠক করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মতামত কোথায় প্রতিফলিত হবে। তাঁর দাবি, এনইআইআর পুরোপুরি কার্যকরের আগে বৈধভাবে সেকেন্ডহ্যান্ড মোবাইল ফোন আমদানির সুযোগ দেওয়া হোক।
এই উদ্যোগের ইতিহাস দীর্ঘ। ২০১২ সালে প্রথম অবৈধ ও অনুমোদনহীন মোবাইল ফোন নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয় সরকার। এরপর ২০১৮-১৯ সাল নাগাদ নীতিগতভাবে কাজ শুরু করে বিটিআরসি। তবে কারিগরি প্রস্তুতির অভাব ও ব্যবসায়ীদের একাংশের বিরোধিতায় সেই কার্যক্রম থমকে যায়।
পরে ২০২১ সালের ১ জুলাই পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম এনইআইআর চালু করে বিটিআরসি। তবে তখন অবৈধভাবে আমদানি করা ফোনসেট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করা এবং ক্লোন হ্যান্ডসেট শনাক্ত করে ব্যবহারে বাধা দেওয়ার ফিচার বাদ রাখা হয়।
অবৈধ ফোনসেটের কারণে বছরে ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে উল্লেখ করে ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর এনইআইআর পুরোপুরি চালুর উদ্যোগ নিতে বিটিআরসিকে চিঠি দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ২০২৫ সালের ২৮ জুন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এ বিষয়ে অনুমোদন দেয়।
এরপর গত বছর ২৯ অক্টোবর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর থেকে এনইআইআর চালুর ঘোষণা দেন। তবে ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে চালুর সময়সীমা আবার পিছিয়ে দেওয়া হয়।
বিটিআরসির নথিপত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের ৯ জুন অর্থনীতি ও জননিরাপত্তার বিষয় উল্লেখ করে এনইআইআর পুরোপুরি কার্যকরের বিষয়ে বিটিআরসিকে চিঠি দেয় জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)। এরপর ২ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সভায় এবং ২২ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এই ব্যবস্থা কার্যকরের বিষয়ে আলোচনা হয়। বিটিআরসির সর্বশেষ কমিশন সভায় ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারির মধ্যে এনইআইআর চালুর প্রস্তাব করা হয়।
বিটিআরসির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা বলেন, সরকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে অবৈধ ফোনের ব্যবহার বন্ধের ওপর জোর দিচ্ছে। এ জন্য বিটিআরসিকে লিখিতভাবে একাধিকবার জানানো হয়েছে। বিটিআরসি সে অনুযায়ী আগামী ১ জানুয়ারি থেকে ধাপে ধাপে এনইআইআর পুরোপুরি কার্যকরের পরিকল্পনা করছে।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, ‘আমরা অবৈধ ফোনের ব্যবহার বন্ধ করতে চাই। তবে এ ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করা হবে না। সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে কার্যকর একটা সমাধান বের করা হবে।’
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জুন পর্যন্ত তাদের এনইআইআর সিস্টেমে ৭৭ কোটি ৬ লাখ আইএমইআই নম্বরের তথ্য সংরক্ষিত ছিল। এগুলোর মধ্যে অন্তত ৪১ কোটি ১৮ লাখ আইএমইআই ছিল গ্রে লিস্টে, অর্থাৎ অনুমোদনহীন তালিকায়।
এমবিসিবির সিনিয়র সহসভাপতি শামীম মোল্লা বলেন, ‘আমরা শুনেছি এনইআইআর পুরোপুরিভাবে চালুর পরিকল্পনা চলছে। এটা নিয়ে আমাদের আপত্তি নেই। তবে আমরা চাই, আমরা যেই সেটগুলো বিক্রি করি, অর্থাৎ সেকেন্ডহ্যান্ড সেট, সেগুলো যেন বৈধভাবে আমদানি করতে পারি, সেই ব্যবস্থাটা যেন করা হয়। অন্যথায় শুধু ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, সাধারণ ক্রেতারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাঁরা কম দামে ফোন কেনার সুযোগ হারাবেন।’
এখন সবার নজর ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া প্রথম ধাপের দিকে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সেকেন্ডহ্যান্ড ফোন বৈধভাবে আমদানির দাবির বিষয়ে সরকার ও বিটিআরসি কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে এই খাতের লাখো মানুষের ভবিষ্যৎ।





