ঢাকায় প্রতি ঘণ্টায় দুটি বিবাহবিচ্ছেদ, আবেদনে এগিয়ে নারীরাই
ঢাকায় বিবাহবিচ্ছেদের হার নিয়ে চমকপ্রদ চিত্র উঠে এসেছে — রাজধানীতে এখন প্রতি ঘণ্টায় গড়ে দুটি করে তালাকের ঘটনা ঘটছে। হিসাব অনুযায়ী, দিনে প্রায় অর্ধশত সংসার ভাঙছে ঢাকায়, আর এই বিচ্ছেদের আবেদনে পুরুষদের চেয়ে এগিয়ে আছেন নারীরাই — সংসার ভাঙার সিদ্ধান্তে বেশি এগিয়ে আসছেন তাঁরাই।
প্রতি ঘণ্টায় দুটি তালাক মানে শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এর পেছনে রয়েছে প্রতিদিন ডজন ডজন পরিবারের ভাঙন। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরীতে এই হার সামাজিক বাস্তবতার একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হলো নারীদের এগিয়ে থাকা। আগে যেখানে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তে নারীদের উদ্যোগ তুলনামূলক কম দেখা যেত, এখন ঢাকায় সংসার ভাঙার আবেদনে নারীরাই বেশি — এই পরিবর্তন সামাজিক মনোভাব ও নারীদের অবস্থানের বদলের দিকেই ইঙ্গিত করে।
বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই বলেন, শিক্ষা ও আর্থিক সচেতনতা বাড়ায় নারীরা এখন অসুখী বা নির্যাতনমূলক সম্পর্কে থেকে যাওয়ার বদলে আইনি পথে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত বেশি নিতে পারছেন। ঢাকার এই চিত্র সেই ধারণার সঙ্গেই মিলে যায় — যদিও প্রতিটি বিচ্ছেদের পেছনের কারণ আলাদা।
নগরজীবনের চাপও এই প্রবণতার একটি প্রেক্ষাপট। জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মজীবনের ব্যস্ততা ও পারিবারিক প্রত্যাশার টানাপোড়েন — মহানগরীর দাম্পত্য জীবনে এসব চাপের ছাপ পড়ছে বলে সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন।
বিচ্ছেদের এই হার পরিবার কাঠামোর ওপরও প্রভাব ফেলছে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ, একক অভিভাবকত্ব এবং বিচ্ছেদ-পরবর্তী আর্থিক ও সামাজিক পুনর্বাসন — প্রতিটি তালাকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এসব প্রশ্ন, যেগুলো পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে ভাবতে হয়।
অন্যদিকে, বিচ্ছেদকে শুধু নেতিবাচক হিসেবে দেখার বদলে অনেকে এটিকে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের অধিকার হিসেবেও দেখছেন। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে — একটি অসহনীয় সম্পর্ক থেকে আইনসম্মতভাবে বেরিয়ে আসতে পারা তাদের জন্য মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
তবে সংখ্যাটি উদ্বেগেরও। প্রতি ঘণ্টায় দুটি বিচ্ছেদ মানে প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবারের ওপর চাপ বাড়ছে; বিয়ের আগের প্রস্তুতি, দাম্পত্য পরামর্শ ও পারিবারিক মধ্যস্থতার মতো সেবাগুলোর প্রয়োজনীয়তা এই পরিসংখ্যান আবার সামনে এনে দিল।
ঢাকার এই চিত্র বাংলাদেশের বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের একটি প্রতিচ্ছবি হিসেবেও দেখা যায়। নগরায়ণ, নারী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রসার যেভাবে সমাজ বদলাচ্ছে, দাম্পত্য সম্পর্কের ধরনও তার বাইরে থাকছে না।
শেষ পর্যন্ত, ঘণ্টায় দুটি তালাকের এই হিসাব একটি প্রশ্নই সামনে আনে — ভাঙনের এই ধারা কমাতে সমাজ ও নীতিনির্ধারকরা কী করবেন, আর বিচ্ছেদ যাঁদের জন্য অনিবার্য, তাঁদের জন্য আইনি ও সামাজিক সহায়তা কতটা সহজলভ্য হবে। দুটি প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের পারিবারিক বাস্তবতাকে গড়ে দেবে।



